কেয়ারটেকার সরকার, না লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড


মুহাম্মদ নজরুল ইসলামঃঃ
মার্কিন ভিসা নীতি ঘোষণার পর থেকে তত্ত্বাবধায়ক বা কেয়ারটেকার সরকারের দাবী জোরদার হয়ে উঠেছে। যদিও প্রধান বিরোধীদল আন্দোলনকে জোরদার করার লক্ষ্যে অদ্যাবধি কোন বড় ধরণের কর্মসূচী ঘোষণা করেনি।

কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠা হলে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে-এমন কথাটা বলা খুবই মুশকিল। কারণ কেবলমাত্র একটা সরকারের মন্ত্রী মিনিস্টারদের হাতেই সরকারের কাজগুলো বা ক্ষমতা থাকেনা। তিনারা কেবল নির্দেশ বা দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ক্ষমতার মালিক হলো প্রশাসন। তারা যদি নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে কোন ধরণের নির্বাচন নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশাসনের সেই ধরণের অবস্থা যেমন নেই, একই ভাবে এই ধরণের অবস্থা তৈরী করা সম্ভবও নয়।

বিধায়, যদি শেখ হাসিনা পদত্যাগও করেন, যদু বা মধু যে কেউ যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হোন। তারপরও নির্বাচনের সকল গুঠি শেখ হাসিনার পক্ষে কাজ করবে এবং করাই স্বাভাবিক। কারণ দীর্ঘ ১০ বছর যারা নিমক খেয়েছে, তারা দূর্দিনে নিমকহারামী করবে না। তাই বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে তত্ত্ববধায়ক সরকার নয়, বরং বেশী প্রয়োজন লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড। কিন্তু সেই বিষয়টার প্রতি না নজর দিচ্ছে আওয়ামীলীগ বিরোধী দল সমূহ, না সুশীল সমাজ কিংবা আন্তর্জাতিক বিশ্ব।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যা রহিত হয়েছে, তা যদি আবার বহাল করা হয়, তাহলে সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতিই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা। আর যিনিই হবেন, তিনি আওয়ামীলীগের নিমকখোরই হবেন। এক, দুই বা তিন যত নামই নেয়া হবে, তাদের সবাই আওয়ামীলীগের সুবিধাভূগী। অতএব, নিমকহারাম না হলে তিনি আওয়ামীলীগের হয়ে কাজ করাই স্বাভাবিক।

নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে নির্বাচন কমিশন। তাদের সকল সদস্য কোন না কোন ভাবে আওয়ামীলীগের নিমকখোর ছিলেন। বিধায়, তারাও নিমকহারাম হওয়ার কথা নয়। বিধায় তারাও আওয়ামীলীগকে জিতিয়ে আনার জন্য সকল ব্যবস্থা করবেন।

নির্বাচন কমিশনের কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যদি আদালতে যান, তাহলে সেখানে আওয়ামীলীগের নিমকখোর বিচারপতিরা রয়েছেন। যাদেরকে প্রটোকল লংঘন করে আওয়ামীলীগ বিচারপতির আসনে বসিয়েছে, তাদের দূর্দিনে তাদের পক্ষে পায় দেয়ার জন্য। তাদেরকে নানাবিধ নিমক খাইয়ে রেখেছে। বিধায় তারাও নিমকহারামী করবেন না।

তৃণমূল অবধি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত সকল কর্মকর্তা আওয়ামীলীগেরই কর্মী। তারা ১০ বছর আগে নিযুক্ত হওয়া এসিল্যান্ডগন। তারাই এখন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কিংবা ডিসি এডিসি কিংবা যুগ্ম সচিবা বা উপসচিবের কাছাকাছি দায়িত্বে নিয়োজিত। তারাই নির্বাচন সমূহে রিটার্ণিং অফিসার বা সহকারী রিটানিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করবেন। বিধায় তাদের আদর্শিক দায়িত্ব হলো আওয়ামীলীগের হয়ে কাজ করা।

আইন শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী-তারা পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনী। তাদের রন্দ্রে রন্দ্রে করা হয়েছে আওয়ামীকরণ। অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাবে তাদেরকে আওয়ামীলীগের স্বার্থ আদায়ের জন্য ছাত্রলীগ থেকে দেখে দেখে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিধায়, তারা অবশ্যই আওয়ামীলীগের পক্ষে কাজ করবেন।

গত ১০ বছরে অবসরে যাওয়া এমন কোন বড় কর্মকর্তা কি পাওয়া যাবে, যিনি চাকুরী জীবন শেষে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। না, পাওয়া যাবে না। কারণ সবাই আওয়ামীলীগের নিমকখোর অথবা তারা আওয়ামীলীগের কর্মী।

অতএব, কেবলমাত্র শেখ হাসিনার পদত্যাগ বা কেয়ারটেকার সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে আগামীর নির্বাচন নিরপেক্ষ করা সম্ভব নয়। নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে হলে নির্বাহী কর্তৃত্বের আসনে থাকা প্রধানকে বদল করে তার অধীনে দীর্ঘ সময় দেশ পরিচালনা করে রন্দ্রে রন্দ্রে থাকা আওয়ামী নিমকখোরদের ওএসডি করতে হবে। আর এজন্য মাত্র ৩ মাস বা ৯০ দিনের সময় যথেষ্ট সময় নয়।

ফখরুদ্দীন মঈনুদ্দিনের সরকারটা একটা কেয়ারটেকার সরকার হলেও তাকে কেউ কেয়ারটেকার সরকার বলেনা। তাদেরকে বলে ১/১১ এর সরকার। সেই সরকার নীতিগত অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা কেয়ারটেকার সরকারের দায়িত্বের মাঝে পড়ে না। তারা সময় নিয়েছিল দুই বছর।

আওয়ামী দূঃশাসনে যে আওয়ামী জঞ্জাল সৃষ্টি হয়েছে, তা পরিস্কার করার জন্যও তেমনি দুই বছর সময় দরকার। সেই দুই বছরের জন্য যে কেয়ারটেকার সরকার হবে, সেই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীর সাথে সাথে প্রশাসনকে আওয়ামীমুক্ত, বিএনপি মুক্ত এবং জামায়াত মুক্ত করা। তুলনামূলক নিরপেক্ষে ব্যক্তিদেরকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন বিন্যাস করা। তাহলে নূন্যতম আশা করা যেতে পারে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের।

অতএব, জাতির কাছে এই প্রশ্ন আসতেই পারেঃ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন-কেয়ারটেকার সরকার, না লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড?

Post a Comment

0 Comments