উলামায়ে
কিরামদের ভাবনার বিষয়
মুহাম্মদ
নজরুল ইসলামঃঃ তাফসীরে ইবনে কাসির
এর সবক’টি খন্ড আপনি কি একসাথে দেখেছেন? খন্ড গুলো একসাথে নিলে কত পৃষ্টা হবে? ড. মুহাম্মদ
মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ১৮ খন্ডের এই তাফসীরের কলেবর হলোঃ ৬৯১১
পৃষ্ঠা।
রায়িসুল
মুফাস্সিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর লিখিত কোন তাফসীর গ্রন্থ নাই। যে তাফসীর
গ্রন্থটি তাফসীরে ইবনে আব্বাস নামে পরিচিত, তা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. কুরআনের
বিভিন্ন আয়াতের যে তাফসীর করেছেন, তার সংগৃহিত সংকলন।
আল্লামা
আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর তাবারী রাহি. এর তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে তাবারীকে প্রথম
লিখিত পূর্ণাঙ্গ তাফসীর গ্রন্থ বলে বিবেচনা করা হয় এবং তারই সংক্ষিপ্ত রূপ হলো আল্লামা
ইবনে কাসীর রাহি. এর তাফসীরে ইবনে কাসির।
আজকাল
আমরা যত ধরণের তাফসীর পড়ি এবং শুনি, তার প্রায় সবই তাফসীরে তাবারী বা তাফসীরে ইবনে কাসির এর রেফারেন্স সমৃদ্ধ। যদি ইমাম তাবারী বা ইবনে কাসির সেই সময়ে তাফসীর না লিখতেন,
তাহলে কুরআনে হাকীমের সত্যিকার ব্যাখ্যা মুখে মুখে আমাদের কাছে কত ধরণের বিকৃত হিসাবে
আমাদের কাছে উপস্থাপিত হতো, তা ভাবলে অবাক হওয়া ছাড়া বিকল্প নাই।
কুরআনের
ব্যাখ্যা হলো কুরআন। কুরআনের পরই রাসূল সা. এর হাদীস সমূহ। ইমাম বুখারী রাহি. সহ সিহাহ
সিত্তার সংকলকরা যদি হাদীসের এই কিতাব গুলো লিখে না যেতেন, তাহলে কত জাল আর কত মিথ্যা
হাদীসে দুনিয়া একাকার হয়ে যেতো-তা কি আমরা একবার চিন্তা করেছি।
আমরা
যারা সহীহ হাদীস আর যয়ীফ হাদীস নিয়ে ঝগড়াঝাটি করি, লম্বা লম্বা অভিমত পেশ করি, তারা
হাদীসের টিকিটাও দেখতে পারতাম না।
কুরআনের
তাফসীর ও হাদীসের এই খেদমতের ধারাহিকতাই সত্য দ্বীনকে কিয়ামত পর্যন্ত চলমান রাখতে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখতে পারে।
আরব
দেশের আলেমগনসহ সারা পৃথিবীর প্রসিদ্ধ উলামায়ে কিরাম ও ইসলামিক স্কলারগন লিখনিতেই এখনো
জোর দিচ্ছেন। সদ্য বিদায়ী ইমাম আল ওয়াসাতিয়া আল্লামা ইউসুফ আল কারদাভী রাহি. এর লিখিত
বইয়ের সংখ্যা কমপক্ষে ১৯২টি।
কিন্তু!
কিন্তু বাংলাদেশের উলামায়ে কিরামগন লেখার চেয়ে বলায় কেন বেশী অভ্যস্ত!!! বড় মাপের আলিমদের
লিখনীর ভান্ডার প্রায় শুন্যের কোঠায়। মাওলানা হাফিজ্জী হুজুর কয়টি কিতাব রচনা করেছেন?
মুফতি শফী রাহি. কয়টি কিতাব রচনা করেছেন? সাইয়েদ কামাল উদ্দিন জাফরীর কিতাবের নাম কি
কেউ বলতে পারবেন? জামায়াতের ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রাহি. এরবাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তাফহীমূল কুরআনের ন্যায় বিশাল তাফসীর গ্রন্থ সহ
কমপক্ষে ১১০টি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রথম আমীর মাওলানা আব্দুর রহীম রাহি. এরলিখিত গ্রন্থ সংখ্যা কমপক্ষে ৩৭টি, সাবেক আমীরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযম রাহি. এরবই সংখ্যা কমপক্ষে ৯৪টি।
বাংলাদেশের
উলামায়ে কিরামদের তাফসীরের জায়গা এখন হয়ে পড়েছে ফেইসবুক আর ইউটিউব। এই ফেইসবুক আর ইউটিউব
সম্পর্কে বলতে চাইঃ
১.
ফেইসবুক ও ইউটিউব মূলতঃ একটি ব্যবসায়িক সাইট। তারা ফ্রিতে আপনার কন্টেন্ট আপলোড করার
সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু ভিউ সংখ্যা আমরা যা দেখি, আসলেই কি তাই? না, বরং তারা তাদের ব্যবসার
স্বার্থে বিজ্ঞাপন দাতাদের আকৃষ্ট করতে তারা ভিউ ভাড়িয়ে দেখাচ্ছে। আমরা মনে করছি ১
মিলিয়ন মানুষ আমার ভিডিওটি দেখেছে। প্রকৃত ব্যাপার কিন্তু তা নয়।
২.
ফেইসবুক আর ইউটিটিব যেহেতু ব্যবসায়িক সাইট, সেহেতু তারা ব্যবসার চিন্তাই মাথায় রেখে
আপনার কন্টেন্টকে প্রচার করে। আর ব্যবসার স্বার্থেই তারা তাদের বিজ্ঞাপন গুলো আপনার
কন্টেন্টের ভিউর অনুপাতে কন্টেন্টের মাঝখানে স্থাপন করে থাকে। এই বিজ্ঞাপন প্রচারের
ক্ষেত্রে তারা কখনো একথা চিন্তা করে না যে, আপনার কন্টেন্টের বিষয়বস্তুর সাথে বিজ্ঞাপনটি
যায় কি না। বিধায় প্রায় সময়ই আমরা কুরআনের তাফসীর শুনতে গিয়ে অর্ধউলঙ্গ মহিলার নাচ
দেখতে বাধ্য হই।
৩.
ফেইসবুক আর ইউটিউবের নিয়ন্ত্রণ যেহেতু আপনার হাতে নয়, সেহেতু যখন ইচ্ছা তখন তারা আপনার
একাউন্টের ভিউ কমিয়ে দিতে পারে, আপনাকে সাময়িক বন্ধ রাখতে পারে এমনকি আপনার শত শত কন্টেন্টে
সমৃদ্ধ একটি একাউন্ট নিমিষে বাতিল করে দিয়ে নিমিষে মিলিয়ে দিতে পারে। বিধায়, এই ধরণের
মাধ্যমের কোন স্থায়িত্ব নেই।
এককথায়
যদি বলতে হয়, তাহলে তা হলোঃ ফেইসবুক বা ইউটিউবে ফসল তথা ভিডিও আপলোড করা মানে হলো অন্যের
জমিতে ফসল ফলানো। যে কোন সময় জমির মালিক তা নিঃশেষ করা ক্ষমতা রাখে।
চলে
আসি মূল আলোচনায়, তাহলে যে সব উলামায়ে কিরাম বক্তব্য, ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদির মাধ্যমে
দ্বীনের খেদমত করছেন, তাদের মনে রাখা দরকার যে,
১.
আপনি যে মধ্যমে তা প্রচার করছেন, সে মাধ্যমটি স্থায়ী কোন মাধ্যম নয়। তার মাধ্যমে আপনার
বক্তব্য অনাদিকাল পর্যন্ত উম্মাহর কাছে পৌছাতে বা ধরে রাখতে পারবেন না।
২.
বক্তৃতা বন্দুকের গুলির মতো-যা একবার মুখ থেকে বের হয়ে গেলে তা এডিট করার কোন সুযোগ
থাকে না।
তাই
দ্বীনের আলোচনাকে যুগ যুগান্তর পর্যন্ত ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য এবং ভূল হলে পরবর্তী
সংস্করণে এডিট করার সুবিধা গ্রহণের জন্য লিখনির বিকল্প নাই। তাই প্রখ্যাত বা অখ্যাত
মুফাস্সিরে কুরআন ও ওয়ায়েজ বা বক্তাদেরকে তাদের পূর্বসূরীদের ন্যায় লিখনির প্রতি মনযোগী
হওয়া প্রয়োজন।
প্রসংগক্রমে আল্লামা সাঈদী রাহি. এর কথা বলা যেতে পারি। তিনি যেই সময়ে তাফসীর পেশ করেছেন, তখন ময়দান ফাঁকা ছিল। সেই সময় তার সমপর্যায়ে কেউ না থাকলেও সমসাময়িক ছিলেন সাইয়েদ কামাল উদ্দিন জাফরী, মাওলানা লুৎফুর রহমান রাহি. এবং মাওলানা এমদাদুল হক ফরিদপুরী রাহি.। কিন্তু আল্লামা সাঈদী ছাড়া কেউ প্যারালাল ভাবে লিখনিতে হাত দেননি। সাঈদী সাহেব দুনিয়ার সফর শেষ করেছেন। ইউটিউব ও ফেইসবুকে তার বক্তব্য এখনো শোনা যায়। এই সাথে তাফসীরে সাঈদী সহ তার বলা সকল কথা তার লিখিত তার কমপক্ষে ৪৮টি বই পাওয়া যাচ্ছে। অন্যান্য উলামায়ে কিরামদের বেলায় তা অনুপস্থিত। কিন্তু আগামী প্রজন্মের জন্য এই প্রজন্মের উলামায়ে কিরামদের চিন্তাভাবনা গুলো লিখিত আঁকারে আসা দরকার। বিষয়টি উলামায়ে কিরাম ভেবে দেখবেন আশা করি।
আমার লেখা অন্যান্য আর্টিক্যাল গুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের হোয়াইটসআপ গ্রুপে যুক্ত হোন।

0 Comments