মাওলানা ইব্রাহীম আলী ছিলেন আমার ফেভারেট উস্তাদ
মুহাম্মদ নজরুল ইসলামঃঃ আমার ফেভারেট ৩জন উস্তাদের কথা কোন এক লেখায় উল্লেখ করেছিলাম। তারা হলেনঃ ১. মাওলানা আজিজুর রহমান (প্রাক্তণ প্রিন্সিপাল, সুজাউল আলীয়া মাদ্রাসা), ২. মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সিদ্দিকী (অধ্যক্ষ, মৌলভী বাজার টাউন সিনিয়র মাদ্রাসা) এবং মাওলানা ইব্রাহীম আলী (আরবী প্রভাষক, পাথারিয়া গাংকুল মানসুরিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা)-যিনি ছিলেন ফুলবাড়ী আজিরিয়া ফাজিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল।
৩জন ফেভারেট উস্তাদের প্রথম দুইজনকে বলার সুযোগ হয়ে উঠেনি-আপনি আমার ফেভারেট উস্তাদদের একজন। কিন্তু তৃতীয়জনকে বলা হয়েছিল কোন এক টেলিফোন সংলাপে। ২জন ফেভারেট উস্তাদ তাদের নামের ক্রম অনুযায়ী দুনিয়ার সফর শেষ করেছিলেন আর সর্বশেষ দুনিয়ার সফর শেষ করলেন মাওলানা ইব্রাহীম আলী হুজুর ১২ই ফ্রেব্রুয়ারী ২০২৬ তারিখে ভোর রাত সাড়ে ৩টায়। উনার ভাতিজা বড়লেখা জামেয়া ইসলামিয়ার শিক্ষক আমার স্নেহাস্পদ মাওলানা রফিকের ফেইসবুক পোষ্টের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলেও কোন ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া দেখার অবস্থায় তখন আমি ছিলাম না।
ফেইসবুকে আমার সর্বশেষ পোষ্টটি ছিল ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ তারিখে (২৭.০৪.২০০৫ থেকে ১১.০২.২০২৬ ফী আমানিল্লাহ)
এই শব্দবলীর মাধ্যমে। সাথে ছিল Qatar Post এর একটি ছবি-যেখানে শেষ কর্মদিবস শেষে আমি দাড়িয়ে আছি।
২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে যে অফিসে কাজ করেছিলাম, সে অফিস থেকে আকস্মিক বিদায় নিতে গিয়ে বড় ধরণের ঝামেলায় পড়ে যাই আর সেই ব্যস্ততা কাঠিয়ে উঠতে উঠতে দুই মাসের বেশী সময় লেগে গেল। এই সময়ে ফেইসবুকে কোন পোষ্ট দেয়া সম্ভব হয়নি। হোয়াইটসআপে ছিলামই না বলা চলে। ২৪ ঘন্টায় ১০ অথবা ১৫ মিনিট কেবল নিউজ ফিডে চোঁখ বুলিয়েছিলাম আপডেট জানতে।
আমার ফেভারেট অপর দুইজন শিক্ষকের দুনিয়ার সফর শেষে তাদের নিয়ে ধারাবাহিক লিখেছিলাম। অথচ মাওলানা ইব্রাহীম আলী সাহেবের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক ছিল। তার সম্পর্কে আরো বিস্তারিত লেখার কথা থাকলেও সম্ভব হয়নি সময়ের গ্যাড়াকলে পড়ে। আজ
একটু সময় পেয়ে বসলাম তাঁকে নিয়ে স্মৃতি চারণে।
মাওলানা ইব্রাহীম আলী সাহেবের সাথে সর্বশেষ কথা হয় গত বছর ২রা জুন ২০২৫-যেদিন সুজাউল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হযরত মাওলানা ফয়জুর রহমান সাহেব ইনতিকাল করেন-আর তিনি ছিলেন দুইয়ূফর রাহান তথা আল্লাহর মেহমান হতে কাবাঘর বাইতুল্লাতে। তার হজ্জের সফরের সফরসংগী ছিলেন তারই ছাত্র দক্ষিণ ভাগের কাতার প্রবাসী আব্দুল কাইয়ুম ভাই। ফেইসবুকে উনার সাথে একটা ছবি দেখার সুবাদে উনা থেকে দোয়া নেয়ার লোভে উনাকে কল দিলাম। কোন সাড়া না পেয়ে আব্দুল কাইয়ুম ভাইকে বললাম। তিনি কথা বলার ব্যবস্থা করে দিলেন। দীর্ঘ কথা হলো। ফয়জুর রহমান সাহেবকে নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ করলেন। অনেক কান্নাকাটি করলেন এবং মৃত্যুর কথা বারবার বললেন। আচমকা বললেনঃ মাওলানা নজরুল, তোমার সাথে অনেক স্মৃতি, তোমার সাথে রয়েছে নিরব ভালবাসা, বারবার বিভিন্ন সময়ে তুমি আমাকে চমকে দিয়ে আমাকে সম্মাণ দিয়েছো, তুমি আমার অসময়ে ছাতার ভূমিকা পালন করেছো, তোমার সাথে মতের অনেক অমিল ছিল জেনেও তুমি আমাকে কেন ভালবাসতে তা জানিনা,
আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন আর যদি আমার মাধ্যমে কোন দিন কোন মনকষ্ট পেয়ে থাকো, তাহলে ক্ষমা করে দিও।
ফয়জুর রহমান সাহেবের প্রসংগে বললেন, সে বয়সে আমার অনেকটা ছোট হলেও কাজে সে আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। আমি অলস মানুষ, কিন্তু ফয়জুর রহমান কাজ পাগল নিরলস মানুষ ছিল। তার কর্মপদ্ধতিতে অনেক ভূল ছিল, কিন্তু দ্বীনি ইলমের খেদমতের জন্য তার মাঝে একটা নেশা ছিল। দৃশ্যত তার সাথে আমার বনিবনা খুব একটা না থাকলেও যখনই দ্বীনের প্রয়োজন মনে করেছি, তখন দূর থেকে হলেও তাকে সহযোগিতা করেছি।
মাওলানা ইব্রাহীম আলী সাহেবের কাছে আমি আলিম শ্রেণীর নুরুল আনওয়ার পড়েছি গাংকুল সিনিয়র মাদ্রাসায়। সুজাউল মাদ্রাসা থেকে ১৯৮৫ সালের শেষ দিকে হিজরত করে ওখানে ভর্তি হয়ে ক্লাশ করেছি। তিনি ক্লাশের ধরণটা এমন ছিল যে, তার কোন ছাত্র অমনযোগী থাকার কোন সুযোগ ছিল না। তার সুনিঁপূণ উপস্থাপনা যে কোন টপিককে স্থায়ীভাবে মনের মধ্যে গেঁথে নিতে সহায়তা করতো। তার ক্লাশের সাবজেক্ট গুলো আমাদেরকে খুব একটা পড়তে হয়নি। তার বলা কথা গুলো নিজের মতো করে পরীক্ষার খাতায় লিখে হাইয়েস্ট মার্কস পাওয়া গেছে।
২০০৩ সালে আমি বিয়ে করি।
বিয়ের দিনের সকাল বেলা সবার আগে আমার বাড়ীতে যে দাওয়াতী মেহমান পৌছেন, তিনি হলেন মাওলানা ইব্রাহীম আলী। উনাকে রাস্তার মধ্যে পেয়ে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। খুব একটা হক আদায় করে দাওয়াত দেয়া হয়নি। কিন্তু তিনি সবার আগেই শুধু উপস্থিত হোননি, বরং বিয়ের আসর বিয়ানী বাজারের আসাবুন কমিউনিটি সেন্টারে পৌছার আগে বিয়ানী বাজার কলেজ মসজিদে জোহারের নামাযের জন্য বাধ্য করেন। এখানেই শেষ নয়, মসজিদের বিয়ের আকদ অনুষ্ঠান সুন্নাহ এই ফতোয়া দিয়ে নামাযের পর মসজিদের মধ্যে আকদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে আমার পরিচিত অনেক উলামায়ে কিরাম উপস্থিত থাকলেও তখন বিয়ের খুতবাটা উনিই দিয়েছিলেন।
২০১১ সালে আমাদের শ্রদ্ধেয় আব্বা দুনিয়ার সফর শেষ করেন, তখন আমরা ৩ ভাই কাতার থেকে তাৎক্ষনিক দেশে যাই। তখনও সিলেট থেকে বাবার লাশ বাড়ীতে পৌছেনি। সকাল বেলা আমরা যখন বাড়ীতে পৌছলাম, তখন যে মানুষটাকে বাড়ীতে পেলাম-তিনি মাওলানা ইব্রাহীম আলী। বাবাকে কবর দিয়ে একে একে সকলেই বিদায় নিলেন, কবরের পাশে দাড়িয়ে আছি কেবল আমি। এমন অবস্থায় দেখলাম পাশে দাড়িয়ে আছেন একজন মাত্র মানুষ, তিনি মাওলানা ইব্রাহীম আলী। ফিরে এলাম বাড়ীতে। সকল আগন্তুক একে একে বিদায় নিলেন, একেবারে শেষে যে মানুষটা বিদায় নিলেন তিনি মাওলানা ইব্রাহীম আলী।
কোন এক ছুটিতে কাতার থেকে বাংলাদেশে গিয়ে যখন জানলাম সুজাউল মাদ্রাসার ওয়াজ মাহফিল। তখন পরিচিতজনদের সাথে সাক্ষাৎ করার লোভে মাহফিলে উপস্থিত হলাম। অধ্যক্ষ মাওলানা ফয়জুর রহমান বাধ্য করলেন বাদ মাগরিব একঘন্টা কথা বলার জন্য। এই খবরটা মাওলানা ইব্রাহীম আলীর নিকট পৌছে গেল। মাওলানা ইব্রাহীম আলী সাথে সাথে বাড়ী থেকে মাহফিলে হাজির। আমার পুরো বক্তব্য শুনলেন মাহফিলের একদম পিছনে মাটিতে বসে আর দোয়া দিলেন। একদিন উনার সাথে যখন দেখা হলো, তখন বললেনঃ মাওলানা নজরুল, বড় একটা ভূল করে ফেলেছো। যদি বিদেশে না গিয়ে ওয়াজের লাইনে সময় দিতে, তাহলে এখন প্রখ্যাত মুফাস্সিরে কুরআন খেতাম থাকতো তোমার। এখন যখন বিদেশে চলেই গেছো, তাহলে এই লাইনে কলমের শক্তিটাকে কাজে লাগাও। উনি নিয়মিত ভাবে আমার লেখা গুলো পড়তেন আর দোয়া করতেন।
কোন এক সফরে ফয়জুর রহমান (নান্দুয়া) সহ মটর সাইকেল যোগে সিলেট থেকে বড়লেখা আসছি। উনার ফুলবাড়ী মাদ্রাসার এলাকা ক্রস করার সময় ফয়জুর রহমান জানালেন যে, এখানে তোমার ইব্রাহীম আলী সাহেব প্রিন্সিপাল। সাথে সাথে গতিপথ চেঞ্জ করে যাত্রা বিরতি। উনার মাদ্রাসায় পৌছে দেখি উনি স্টাফ মিটিং করছেন। আমাদের দেখা মাত্র বিরতি দিয়ে ১ মিনিট কথা বললেন এবং পরে স্টাফ মিটিং স্থগিত করে দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আমাদের সাথে কথা বললেন-উনি সেই মাওলানা ইব্রাহীম আলী।
উনার সাথে কাতার থেকে মাঝে মাঝে আমার কথা হতো। ছাত্রকে সম্মাণ করে কথা বলার
ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক অনন্য উদাহরণ। তার ছেলে হাফেজ হয়েছে এই খবরটা উনি আমাকে
দিয়েছিলেন অতি উচ্চাসের সাথে। সন্তান কিভাবে পিতামাতার চক্ষু শীতলকারী হয়, তা সেদিন তার আলোচনা থেকে বুঝেছিলাম।
ব্যক্তিগত জীবনে অথবা তার শিক্ষকতা জীবনের পুরো অংশ জুড়ে তার আশে পাশে যারা
ছিলেন, তারা সবাই জামায়াতে ইসলামী বা ইসলামী ছাত্রশিবিরের
লোক ছিলেন। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত ভাবে জামায়াতে ইসলামীর সাথে ছিলেন না, বরং তিনি জামায়াত বিরোধী লোক বলে জামায়াতী মহলে বেশ প্রচার ছিল। আমি আমার
জীবনে উনার ছাত্র থাকার পর উনার সাথে দুই বছর চাকুরী করার পর দীর্ঘদিন উনার
সান্নিধ্যে ছিলাম। কিন্তু তার কোন বক্তব্য মন্তব্য বা একটিভিটিজে আমার তা চোঁখে
পড়েনি। তবে জামায়াত বা শিবিরের অনেক দায়িত্বশীল বা ব্যক্তির ব্যাপারে উনার
ভূমিকাটা পক্ষের ছিল না। অপর দিকে একই বিষয়ে ঐ দায়িত্বশীল বা ব্যক্তির ব্যাপারে
জামায়াতের লোক বলে পরিচিতদের ভূমিকাটাও পক্ষে ছিল না। বিধায় ওটাকে আমি ব্যক্তিগত
ভাল লাগার পর্যায়ে সব সময় গণ্য করতাম।
তিনি তারা পুরোটা জীবন আগাগোড়া একজন শিক্ষক হিসাবেই ভূমিকা রেখেছেন। সব সময়
দেওবন্দী আকাবীরদের সম্মাণ করে চলেছেন এবং সকল ঘরোনার আলেমদের সম্মানের সাথে
নিয়েছেন।
সকল বিষয়ে তার সীমাহীন পান্ডিত্য ছিল। তিনি টিচার ছিলেন, কিন্তু বক্তা ছিলেন না। তাই বড় আলেম হিসাবে তার তেমনটা পরিচিতি ছিল না, যেমনটা তার ছাত্রদের ছিল। বড়লেখা উপজেলার সাবেক দায়িত্বশীল মরহুম হাফিজ নিজাম
উদ্দিন, মরহুম হাফিজ রমিজ উদ্দিন, মাওলানা গৌছ উদ্দিন, মাওলানা উসমান আলী, মাওলানা ইসলাম উদ্দিন, মরহুম মাওলানা ফয়জুর রহমান (হাতলিয়া), মাওলানা ফয়জুর রহমান (নান্দুয়া), জনাব আকমল হোসাঈন সহ নাম উল্লেখ না করা অনেক
অনেক দায়িত্বশীল তার সরাসরি ছাত্র। কিন্তু যারা তার সরাসরি ছাত্র নন বড়লেখা
উপজেলার এমন একজন মাওলানাকে পাওয়া খুবই মুশকিল, যার সাথে তা হৃদ্যতা ছিলনা। তিনি যারা সাথে কথা বলতেন, সেই ব্যক্তিটি ঘোষিত বা অঘোষিত তার মুরিদ হয়ে যেতোই। আমি তার এমনই একজন মুরিদ
ছিলাম।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আমার সুপ্রিয় উস্তাদ, আমার ফেভারেট টিচার হযরত
মাওলানা ইব্রাহীম আলীকে রাহমাতের চাদরে ঢেকে রাখুন। জান্নাতে তাঁরই কাছে তাঁর জন্য
একটি ঘর বানিয়ে সে ঘরে তাঁকে মেহমান হিসাবে কবুল করুন। আমীন।।

0 Comments