দূঃখ ও বিষন্নতাঃ কুরআন
ও সুন্নাহর আলোকে
পর্বঃ ২
দূঃখের প্রকারভেদ
প্রথমতঃ দুনিয়ার কোন বিষয় হারানোর কারণে দূঃখ বা চিন্তার সূত্রপাত। মুমিনদেরকে
দুনিয়ায় কোন বিষয় হারানোর ক্ষেত্রে দূঃখিত বা চিন্তিত না হওয়াই উত্তম। মুমিনদেরকে মনে রাখতে হবে
এই দুনিয়া পরকালের তুলনায় কিছুই না। অতএব, দুনিয়ায় কোন বিষয় হারানোতে অতিরিক্ত দূঃখ না করা। এমনটা করা আল্লাহর
সিদ্ধান্ত ও তাকদীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার নামান্তর। তবে দূঃখ পাওয়া বা চিন্তা করা একটি
স্বাভাবিক অনুভূতি-জন্মগত অনুভিূতি।
মানুষ আশরাফূল মাখলুকাত। তার পজিশন হলোঃ দূঃখে চিন্তিত না হয়ে দূঃখকে
জয় করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বলেনঃ
﴿مَآ أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍۢ فِى ٱلْأَرْضِ
وَلَا فِىٓ أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِى كِتَـٰبٍۢ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَآ ۚ
إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٌۭ﴾﴿لِّكَيْلَا تَأْسَوْا۟ عَلَىٰ مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا۟ بِمَآ ءَاتَىٰكُمْ ۗ
وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍۢ فَخُورٍ﴾
“যে কোনো বিপদ যা পৃথিবীতে বা তোমাদের মধ্যে ঘটে, তা অবশ্যই এমন একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে যা তার সৃষ্টি
করার আগেই নির্ধারিত ছিল। নিশ্চয়ই এটি আল্লাহর কাছে সহজ। যেন তোমরা তোমাদের হারানো বিষয়ে শোক না করো এবং যেটা পেয়েছ
সেটা নিয়ে অতিরিক্ত আনন্দ না করো । আল্লাহ প্রতিটি অহংকারী ও নিজেকে
বড় মনে করাদেরকে পছন্দ করেন না।” (আল হাদীদঃ ২২-২৩)
দ্বিতীয়তঃ পছন্দনীয় দূঃখ। যে দূঃখের প্রশংসা করেছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। যেমনঃ দ্বীনি কোন বিষয়ে দূঃখ করা। আর এমন দূঃখ, যা কাজে
হতাশার তৈরী না করে কাজের প্রেরণা যোগায়। এটি ইচ্ছাকৃত দূঃখ, যা ব্যক্তির চিন্তা ও বিশ্বাসের সাথে
সম্পর্কিত এবং এমন দূঃখ বা চিন্তা মানুষের ঈমান বাড়া কমার সাথে উঠানামা করে। যেমনঃ
তাবুক যুদ্ধের সময় অভাবী মানুষদের দূঃখ; যারা রাসূলুল্লাহ সা. এর খেদমতে গিয়েছিলেন এবং তাদেরকে
জিহাদের জন্য সাথে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রাসূল সা. তাদের সাথে
নেওয়ার উপায় পাননি। তাই তারা ফিরে গিয়েছিলেন এবং তাদের ওপর দুঃখ, কষ্ট ও বেদনা নেমে এসেছিল। আল্লাহ তাআ’লা তাদের প্রশংসা
করেছেন এ ভাবেঃ
﴿وَلَا عَلَى الَّذِينَ إِذَا مَا أَتَوْكَ
لِتَحْمِلَهُمْ قُلْتَ لَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُكُمْ عَلَيْهِ تَوَلَّوا
وَّأَعْيُنُهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ حَزَنًا أَلَّا يَجِدُوا مَا يُنفِقُونَ﴾
“একইভাবে
তাদের ওপর অভিযোগ নেই, যারা যখন তোমার কাছে তোমার সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আসল
তখন বললে,
‘আমার সঙ্গে তোমাদের বহন করার মতো কিছু নেই।’ তারা ফিরে গেলো এবং তাদের
চোঁখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল-দুঃখের
কারণে যে তারা ব্যয় করার মতো কিছু খুঁজে পায়নি।” (আত তাওবাহঃ
৯২)
এ ধরনের দুঃখের একটি উদাহরণ হলো রাসূল সা.-এর
মৃত্যু পরবর্তী সময়-যা মুসলিমদের
জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ছিলো। তাঁর মৃত্যু পর হযরত আবু বকর রা. ও হযরত উমর রা. দূ’জন মিলে উম্মে আইমান রা.
এর কাছে গিয়েছিলেন তার সাথে দেখা করতে। যখন তারা তাঁর কাছে পৌঁছলেন, তখন উম্মে আইমান রা. কান্না করতে শুরু করলেন। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি কাঁদছ কেন? আল্লাহর কাছে যা আছে তা অবশ্যই রাসূলের জন্য উত্তম। তিনি বললেনঃ
আল্লাহর কসম! আমি এটা জানিনা-এমন নয়। আল্লাহর কাছে যা আছে তা রাসূলের জন্য উত্তম। কিন্তু আমি কাঁদছি এজন্য যে, এখন
থেকে আসমান থেকে ওহী আসা বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর এই কথা দু’জনকে এতটাই
আবেগপ্রবণ করে তুললো যে, তাঁরাও কাঁদতে শুরু করলেন। (মুসলিম)
অর্থাৎ উম্মে আইমান রা. এর দূঃখটা ছিল ওহী
আসার পরম্পরা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে, রাসূল সা. এই এর মৃত্যুর কারণে নয়।
এই দুঃখগুলো স্থায়ী হওয়া উচিত নয়, বরং আমাদের এগুলোকে অস্থায়ী ধরে নিয়ে কাজ ও উৎপাদনমুখী
জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। দুঃখ বা বিপর্যয়ের বার্ষিকী পালন করা আমাদের জন্য উচিত
নয়,
যেমনটি অতীতের সময়ের পবিত্র ও উত্তম যুগের লোকেরা করতো না; সাহাবায়ে কিরাম রা. নবী সা. এর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কোন
বিশেষ সভা করতেন না এবং নবী সা.
নিজেও তাঁর চাচা হযরত হামযা রা. সহ অন্যদের মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে কোনো দিন
নির্ধারণ করতেন না।
(ড. আব্দুল্লাহ আল খাতির রাহি. রচিত “আল হুজন ওয় আল ইকতিয়াব” গ্রন্থের ভাবধারা অবলম্বনে
রচিত)
প্রথম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

0 Comments