দূঃখ ও বিষন্নতাঃ কুরআন
ও সুন্নাহর আলোকে
পর্বঃ ৪-দ্বিতীয়
অংশ
ডিপ্রেসনের চিকিৎসা
ঘ. মুসিবত ও দূঃখ দুর্দশা সম্পর্কে মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গিঃ
মুসলমানদের এই ধারণা, যা সোনার পানিতে লিখে রাখার মতো মূল্যবান। যারা এই ধারণাকে ধারণ করেনা, তাদের জীবন
কষ্ট আর দুঃখে পরিপূর্ণ। ধারণাটি হলোঃ মুসলমানরা এই ঈমান রাখে যে, মুসিবত হলো বান্দার
প্রতি আল্লাহর ভালবাসার একটি নিদর্শন। যেমনটা রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ যখন আল্লাহ
কোন জাতিকে ভালবাসেন, তখন তিনি তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলেন। (আহমাদ)
একই ভাবে মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, পরীক্ষা
বা বিপদ আপদ ঈমান অনুযায়ী হয়ে থাকে এবং মুসলমান সব সময় রাসূলুল্লাহ সা. এর এই হাদীসটি
স্মরণ করে থাকেঃ وَأَشَدُّ النَّاسِ بَلَاءً: الأَنْبِيَاءُ، ثُمَّ الصَّالِحُونَ، ثُمَّ
الأَمْثَلُ فَالأَمْثَلُ.“সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন নবীগণ, তারপর নেককারগণ, তারপর যারা তাদের মতো, তারপর যারা তাদের
মতো…” (তাবরানী)
এর মানে হলোঃ আপনার যত বেশী ঈমান মজবুত হবে, আপনার পরীক্ষাও তত বেশী হবে, আপনার পরীক্ষা যত হালকা
হবে, আপনার ঈমানের শক্তি তত কমতে থাকবে। আর একথা আল্লাহর রাসূল সা. এর সেই হাদীসকে প্রমাণ করে, যেখানে বলা হয়েছেঃ
فَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ صَلَابَةٌ ٱشْتَدَّ بَلَاؤُهُ،
وَإِنْ كَانَ فِي دِينِهِ رِقَّةٌ ٱبْتُلِيَ عَلَىٰ قَدْرِ دِينِهِ.
যদি কারো দ্বীনের মাঝে দৃঢ়তা থাকে, তবে তার
পরীক্ষাও কঠোর হয়। আর যদি কারো দ্বীনের মধ্যে দূর্বলতা থাকে, তবে পরীক্ষা
হয় তার দ্বীনের মানের অনুপাতে। (জামে সগীর)
একজন মুসলমান এই ঈমান রাখেন যে, কোনো বিপদ
আসামাত্রই সে তার জন্য সওয়াব পাবে-আর ধৈর্য ধারণের বিষয়টি তো রয়েছেই। আমাদের নবী মুহাম্মদ সা. বলেছেনঃ
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ،
وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ، وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ؛ حَتَّى الشَّوْكَةَ يُشَاكُهَا
إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
“কোনো মুসলমানের যদি কষ্ট, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ,
কষ্ট কিংবা উদ্বেগ হয়-এমনকি যদি তার গায়ে একটি কাঁটাও বিঁধে-তবুও আল্লাহ
সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা এর বিনিময়ে তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।” (বুখারী ও মুসলিম)
একজন মুসলমান যখন এ বিশ্বাস রাখে যে, তখন সে আল্লাহর
প্রতি ঈমান আনার মাঝে প্রশান্তি পায়, আর আল্লাহর
উপর তার ভরসা করার শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং সে তখন আল্লাহ নির্ধারিত তাকদীরের প্রতি সম্পূর্ণরূপে
আত্মসমর্পণ করে।
বিধায় কেউ যদি বিপদের আগেই ধৈর্য ধারণ করে থাকে, তাহলে তো
এটি আরও বড় ফজিলতের বিষয়।
নিশ্চয়ই বিপদের উপর সবর করার মধ্যে আল্লাহর কাছে রয়েছে বড় প্রতিদান। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’য়ালা বলেনঃ
﴿إِنَّمَا يُوَفَّى ٱلصَّـٰبِرُونَ أَجْرَهُم
بِغَيْرِ حِسَابٍۢ﴾
“নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের পুরস্কার বিনা হিসাবে
প্রদান করা হবে।” (আয যুমারঃ ১০)
মুমিনরা সর্বাবস্থায় কল্যাণকর অবস্থায় থাকে। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূল সা. বলেনঃ
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ؛ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ
خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَلِكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ: إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ
شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا
لَهُ
“একজন মু’মিনের ব্যাপার সত্যিই বিস্ময়কর! তার
সব কিছুই কল্যাণে পরিপূর্ণ। আর এই বৈশিষ্ট্য কেবল মু’মিনের জন্যই বরাদ্দ-অন্য কারো জন্য নয়। যদি তার কোনো কল্যাণকর ঘটনা ঘটে, সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণ
বয়ে আনে। আর যদি তার ওপর কোনো বিপদ
আসে, সে ধৈর্য ধারণ করে, এটাও তার জন্য কল্যাণকর
হয়।”
বিপদের ব্যাপারে মুসলমানদের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা একটি বিশেষ ও মহৎ দৃষ্টিভঙ্গি-এমন দৃষ্টিভঙ্গি যা নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা
করা যায়। একে একাই তা আমাদের বিভিন্ন
সমস্যা থেকে রক্ষা করতে পারে এবং আল্লাহ্র ইচ্ছায় দুঃখ-দুর্দশা থেকেও নিরাপদ রাখতে
পারে।
বর্ণিত হাদীস গুলো এবং তার অন্তর্নিহিত অর্থ
পাঠকের মনে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে, তা অনুমেয়। এর সাথে মুসলিম জাতির বাস্তবিক অভিজ্ঞতার এক বিশাল ভান্ডার রয়েছে, যা ধর্মীয় শিক্ষা ও বিশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন। এ পর্যায়ে আমরা দুটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরা
হলো:
উদাহরণ-১
এটি একজন নারীর গল্প। আমাদের সকলের জানা আছে যে, বিপদের সময়
সাধারণত নারীরা কম ধৈর্য ধারণ করতে পারেন, তারা সহজে প্রভাবিত
হোন। কিন্তু এই গল্পটি একজন প্রসিদ্ধ
কবি ও সম্মানিতা মহিলা সাহাবী হযরত খনসা রা. এর।
হযরত খানসা রা. এর আসল নাম
ছিল তামদ্বির বিনতে আমর রা.। জাহিলিয়াতের সময়ে তিনি মাঝে মাঝে দুই এক লাইনের কবিতা লিখতেন। কিন্তু যখন তার ভাই সাখর ইনতিকাল করলেন, তখন তিনি গভীর শোকে নিমজ্জিত হলেন এবং ভাইয়ের স্মরণে অনেক দীর্ঘ ও গভীর অর্থবহ
কবিতা রচনা করেন-যা পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যপুস্তকে
যুক্ত করা হয়। তিনি লিখেনঃ
تَبْكِي خَنّاسٌ عَلَى صَخْرٍ وَحَقَّ لَهَا، أَنْ
رَابَهَا الدَّهْرُ، إِنَّ الدَّهْرَ ضَرَّارُ.
“তাঁকে হারিয়ে খনসা কাঁদে এবং তার জন্য কাঁদা একান্তই প্রযোজ্য, কারণ সময়ই তাকে কষ্ট দিয়েছে, নিশ্চয়ই সময় বড়ই ক্ষতিকর।”
يُذَكِّرُنِي طُلُوعُ الشَّمْسِ صَخْرًا، وَأَبْكِيهِ
لِكُلِّ غُرُوبِ شَمْسٍ - وَلَوْلَا كَثْرَةُ الْبَاكِينَ حَوْلِي، عَلَى إِخْوَانِهِمْ لَقَتَلْتُ
نَفْسِي.
“সূর্য ওঠা আমাকে সাখরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, আর আমি তাকে প্রতিটি
সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় কাঁদি।”
“আমার চারপাশে যারা তাদের ভাইদের জন্য কাঁদে, তাদের সংখ্যাই যদি এত বেশি না হতো, তাহলে আমি শোক সহ্য করতে না পেরে নিজেকে হত্যা করতাম।”
তিনি তার কবিতায় বুঝাতে চেয়েছেনঃ যদি আমার মতো এমন কেউ না থাকত, যাদের ভাই মারা গেছে এবং যারা তাদের ভাইদের জন্য কাঁদে-যার মাধ্যমে
আমি সান্ত্বনা পাই, তাহলে আমি দুঃখে আত্মহত্যা করতাম।
এই মহীয়সী নারী-যিনি জাহিলিয়াত যুগে ভাইয়ের মৃত্যুতে
অতি দুঃখে ডিপ্রেসনে পড়েছিলেন-তিনিই ইসলাম গ্রহণ করার পর সম্পূর্ণ বদলে যান। আল্লাহর প্রতি ঈমান ও আকীদা তাঁর অন্তরকে দৃঢ় করে তোলে।
তিনি ও তাঁর চার ছেলে ইসলাম গ্রহণ করেন। এই চার ছেলে কাদিসিয়ার যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধের আগের রাতে এই নারী
তাঁদেরকে জিহাদের জন্য উৎসাহিত করেন আর যুদ্ধ শেষ হতেই তাঁর কাছে খবর আসে-তাঁর চার
ছেলেই একদিনে শাহাদাত বরণ করেছেন।
ভাইয়ের মৃত্যুতে শোকে ডিপ্রেসনে চলে যাওয়া এই
নারী সন্তান হারানোর পর তিনি ধৈর্য হারাননি, বিলাপ করেননি। বরং আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট ছিলেন। এটিই ইসলামী আকীদার বাস্তব প্রভাব-যা একজন মানুষের শোক, কষ্ট ও বিপদকে ধৈর্যে পরিণত করে।
আল্লাহু আকবার! কি মর্মান্তিক দুর্দশা এই মহিলার জন্য, যখন একদিনে তার চার সন্তানকে হারাতে হলো? আর সে কী প্রত্যাশা করা যেতো তার থেকে, যখন সে তার ভাই সখরের জন্য গোটা দুনিয়া মাতমে ভাসিয়ে দিয়েছিল, যে মৃত্যু হয়েছিল কাবিলার যুগে?
আপনি জানেন কি, সন্তানের শাহাদাতের খবর পেয়ে এই মহিলা কী করেছিলেন? যখন তার সন্তানদের শাহাদাতের খবর এলো, তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহ তাদেরকে রহম করুন এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট
করুন। তিনি
বললেনঃ “সকল সন্তানদের নিহত হওয়ায় আল্লাহর শোকরিয়া, যিনি আমাকে এ সম্মান দিয়েছেন। আমি আমার
রবের কাছে আশা রাখি যে, তিনি আমাকে তাদের
সঙ্গে তাঁর রহমতের স্থানে মিলিত করবেন।” সুবহানাল্লাহ... এটুকুই কি সব কিছু?
হ্যাঁ, সত্যিই, কোনো শোকের কবিতা নেই, কোনো দুঃখের গান নেই, কোনো জাহিলিয়াহর মতো আচরণ নেই-যেমন গালে থাপ্পর মারা, জামা ছিঁড়ে ফেলা বা কান্না করা-ইত্যাদি কোন আচরণ নেই। তাহলে কোন জিনিস এই মহিলার মধ্যে পরিবর্তন ঘটলো!!!
এটাই হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান, পরকালের
প্রতি বিশ্বাস, তাকদীর ও ভাগ্যের ওপর আস্তা।
এটাই আখেরাত সম্পর্কিত ধারণা, আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদানের আস্তা এবং শহীদদের জন্য
আল্লাহ যে স্থায়ী নেয়ামত ও জান্নাত প্রস্তুত রেখেছেন, তার ওপর একীন।
যদিও তিনি অনেক বয়সী মহিলা এবং বড় বয়স্করা সাধারণত
যে কোন ঘটনার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হোন এবং তিনি একজন নারী, যাদের মধ্যে ডিপ্রেসন
বেশি দেখা যায়। কিন্তু এই সম্মানিত মহিলা মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে তা হলো, তার ধৈর্য এবং আল্লাহর
প্রতি ঈমানই সেই কাজটি করেছে, যা ঈমানদারদের মনোভাব পরিবর্তন করে ফেলে।
উদাহরণ-২
এই উদাহরণটি সংকলন করেছেন ইবনে জাওযী রাহি.
তার ছাইদুল খাত্বির গ্রন্থে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি একটা বড় রকমের
বিপদে পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন-যাতে বিপদটি দূর হয়ে যায়। কিন্তু তার দোয়ার জবাব আসতে দেরী হয়ে গিয়েছিল।
ইবনে জাওযী রাহি. বলেনঃ দোয়া করার পর দোয়ার কোন ফলাফল না হওয়াতে আমি মনে করলাম
এটা আরেকটা বিপদ। তখন শয়তান এসে আমাকে কূমন্ত্রনা দিতে লাগলো। আমি বললামঃ লজ্জিত হও, তুমি অভিশপ্ত,
আমি তোমাকে বিচারক বানাইনি। এরপর আমার
মন আমাকে বললোঃ এই বিপদ থেকে আমাকে শান্তি দাও। তখন আমি
বললামঃ
১. যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা
মালিক, আর মালিকের অধিকার রয়েছে তিনি যখন খুশী দেবেন আর যখন খুশী
ফিরেয়ে নেবেন। সুতরাং তাঁর কোন ফায়সালায় আপত্তি করার আমার কোন
অধিকার নাই।
২. তাঁর
হিকমত (প্রজ্ঞা) স্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হতে পারে, তুমি কোনো বিষয়কে কল্যাণকর মনে করছো, অথচ প্রকৃতপক্ষে হিকমতের দৃষ্টিকোণ থেকে তা কল্যাণকর নয়। হতে পারে এ ঘটনাটিও তেমনি ধরণের কিছু। যেমনঃ একজন চিকিৎসক রোগীর কল্যাণের উদ্দেশ্যে কখনো কখনো এমন কিছু করেন
যা বাহ্যিকভাবে কষ্টদায়ক মনে হয়-তবে তার মধ্যে কল্যাণ নিহিত থাকে।
৩. দেরি হওয়াটাই হতে পারে মঙ্গলজনক, আর তাড়াহুড়ো করাটা হতে পারে ক্ষতিকর। রাসূলুল্লাহ
সা. বলেছেনঃ
وَلَا يَزَالُ الْعَبْدُ بِخَيْرٍ مَا لَمْ يَسْتَعْجِلْ،
يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي
“বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যেই থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে। সে বলেঃ
আমি দোয়া করেছি, কিন্তু কবুল হয়নি।” (মুসলিম)
৪. হতে পারে তোমার ভেতরের কোনো দোষের কারণে দোয়ার
উত্তর স্থগিত রাখা হয়েছে। যেমনঃ তোমার মধ্যে কোনো রোগ আছে। অথবা হতে পারে, তুমি যা খাচ্ছো তাতে সন্দেহজনক কিছু রয়েছে, কিংবা দোয়ার সময় তোমার হৃদয় ছিলো গাফিল, নতুবা তোমার এমন কোনো গুনাহ রয়েছে যার থেকে তুমি সত্যিকারের তাওবা করোনি-ফলে তোমার
প্রয়োজন পূরণ না করে সেই গুনাহর কারণে তোমাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
৫. হতে পারে দোয়ার জবাব পাওয়ার ফলে কোনো গোনাহ
বৃদ্ধি পেতো বা উত্তম অবস্থান বা মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে দেরী হতো; এজন্যই ফলাফল থেকে বিরত রাখা বা বিলম্ব করানো বেশি লাভজনক হয়েছে।
৬. এমনটাও হতে পারে, তুমি যা
হারিয়েছো, তা-ই তোমাকে আল্লাহর দরবারে দাঁড়াতে ও তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য করেছে। আর যেটা তুমি চাইছিলে, যদি সেটা
পেয়ে যেতে, তাহলে হয়তো সেটিই তোমাকে যাঁর কাছে চাচ্ছো-তথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ারার-স্মরণ ও ইবাদত থেকে
গাফিল করে দিত।
আর তুমি যদি এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করো, তাহলে তুমি
সেই সবকিছুর চেয়ে অধিক উপকারি কিছুর সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়বে যা তুমি হারিয়েছো-যেমনঃ
কোনো ঘাটতি পূরণ করা,
কোনো ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া, কিংবা সমস্ত
জগতের প্রতিপালকের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা।
(এপর্যন্ত আমরা ইবনে জাওযী রাহি. এর কথাগুলো বলছিলাম)
আধুনিক মনোরোগ চিকিৎসকরা বর্তমানে যে পদ্ধতির
ব্যবহার করেন, তাকে বলা হয় “চিন্তাধর্মী চিকিৎসা”
(Cognitive
Therapy)। এতে একজন ব্যক্তি নিজেই নিজের সাথে কথা বলে, নিজের মনকে যুক্তি দিয়ে বোঝা এবং এরপর স্বস্তি অনুভব করে।
উপরের উদাহরণগুলোর সাথে পশ্চিমাদের জীবনের
সাথে তুলনা-যারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে না। পশ্চিমাদের একজন বৃদ্ধা মহিলা, যার বিড়াল মারা
যাওয়ার কারণ সে আত্মহত্যা করে... আর একজন বৃদ্ধ পুরুষ কুকুর হারানোর কারণে আত্মহত্যা
করে... এ কেমন হতভাগা জীবন? বিড়াল বা কুকুর
কি মানুষের জীবনে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে, যার জন্য সে নিজের জীবন শেষ করে দেয়?
হযরত খানসা রা. ও ইবনে জাওযী রাহি. উদাহরণ গুলোর সাথে আমরা যদি বর্তমান
পশ্চিমা দুনিয়ার জীবনাচরণ তুলনা করি, তাহলে আমরা ঈমানের মহত্ত্ব
ও ইসলামের নিয়ামতের মহিমা অনুধাবন করতে পারবো। সুতরাং সকল
প্রশংসা আমাদের মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার, যিনি আমাদেরকে হেদায়াতের পথে এনেছেন।
দুইঃ পবিত্রতা ও সৎকর্ম
এতক্ষণ ডিপ্রেসনের চিকিৎসার প্রথম কথা-আক্বীদাগত
চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ পর্যায়ে দ্বিতীয় প্রকারের চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
আর তা হলোঃ পবিত্রতা ও সৎকর্মের মাধ্যমে চিকিৎসা।
আল্লাহর ভয়ভীতি বা তাকওয়া আর আমলে সালেহ বা সৎকর্ম
আত্মার জন্য একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে, যা দুঃখ, ডিপ্রেসন বা বিষন্নতা ও কষ্ট থেকে
মুক্তি প্রদান করে। যেমনটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বলেনঃ
﴿مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ
أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً ۖ
وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾
“যে কোনো মুমিন পুরুষ বা মহিলা, আমলে সালেহ বা সৎকর্মে নিযুক্ত থাকবে, আমরা তাদেরকে সুন্দর জীবন দান করব এবং তারা যে কাজগুলো
করেছিলো তার উত্তম প্রতিদান দেব।” (আন নাহলঃ ৯৭)
স্বভাবতঃ প্রশ্ন জাগে সুন্দর জীবন জীবন কি?
কিংবা এটা কি সুখও প্রশান্তি নয়। যারা সুখের জীবন অনুসন্ধানী এবং যারা সুন্দর সুখকর জীবন
বিষয়ে কথা বলেছেন, তারা এই সুখকর জীবনের সন্ধান পাবেন না সৎকর্ম ছাড়া। ইব্রাহীম ইবনে আদহম রাহি.
বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমরা এমন এক নিয়ামতের মধ্যে আছি, যার খবর রাজা বাদশা বা তাদের
সন্তানেরা যদি পেতো, তাহলে তারা এর জন্য তলোয়ার দিয়ে লড়াই করতো।
অতএব, এটা হলো ঈমানের নিয়ামত, এটা হলো
প্রশান্তির নিয়ামত, এটাই প্রকৃত সুখ-যা বেশীর ভাগ মানুষ খুঁজে পায় না। কবি বলেনঃ সুখ কোনো অর্থ জমানোর
মধ্যে নেই, বরং ঈমানদার ব্যক্তিই প্রকৃত সুখী; সত্যিই ঈমানদারই সুখী।
তিনঃ দোআ’,
তাসবীহ ও সালাত
দোআ’ দুই প্রকারের হতে
পারে। ১. প্রতিরোধমূলক। ২. চিকিৎসামূলক।
প্রতিরোধমূলক দোআ’র উদাহরণ হলো হযরত আনাস রা. বর্ণিত রাসূল সা. এই দোয়া, যা বুখারী
ও মুসলিমে উল্লেখিত হয়েছেঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحَزَنِ،
وَالعَجْزِ وَالكَسَلِ، وَالبُخْلِ وَالجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুঃখ ও
চিন্তা থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের বোঝা এবং মানুষের উপর কর্তৃত্ব
তথা জুলুম বা প্রভাববিস্তার থেকে।”
চিকিৎসামূলক দোআ’র বিষয়টি আমরা পাই হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত রাসূল সা. এর এই উক্তি থেকে।
যে কোনো বান্দার ওপর যদি কোনো দুঃখ বা বিষণ্ণতা
আসে এবং সে বলেঃ
اللهم إني عبدك وابن عبدك وابن أمتك ناصيتي بيدك
ماض في حكمك، عدل في قضاؤك، أسألك بكل اسم هو لك سميت به نفسك أو أنزلته في كتابك
أو علمته أحداً. من خلقك، أو استأثرت به في علم الغيب عندك أن تجعل القرآن ربيع
قلبي ونور صدري وجلاء حزني وذهاب همي، إلا أذهب الله هـمـه وحزنه، وأبدله مكانه
فرجا. صحيح الكلم الطيب.
“হে আল্লাহ, আমি তোমার দাস, তোমার দাসের
পুত্র এবং তোমার বান্দীর পুত্র। আমার নিয়ন্ত্রণ তোমার হাতে, তোমার ফয়সালা চলমান এবং তোমার বিচার ন্যায়সঙ্গত। আমি তোমার প্রতিটি নামের মাধ্যমে তোমার কাছে দোয়া
করছি-যেই নাম তোমার নিজের জন্য নির্ধারিত অথবা যেটি তুমি তোমার কিতাবে অবতীর্ণ
করেছ অথবা যেটি তুমি কাউকে শিখিয়েছ অথবা যেটি তোমার সৃষ্টিদের মধ্যে
রয়েছে অথবা যেটি তুমি তোমার গোপন জ্ঞানে একান্তে রেখেছ, যে নাম দিয়ে
তুমি আমার হৃদয়ের জন্য কুরআনকে বসন্ত, আমার বুকের জন্য আলোক, আমার দুঃখ
দূর করার জন্য জ্বালা এবং আমার উদ্বেগ দূর করার জন্য সমাধান করো।"
তখন আল্লাহ তার দুঃখ এবং বিষন্নতা দূর করবেন এবং
তার পরিবর্তে মুক্তির রাস্তা খুলে দেবেন। (মুসনাদে আহমদ)
বিধায়, যে এই হাদীসগুলোতে ঈমান রাখে এবং সে অনুযায়ী আমল করে, সে যখন কোন বিপদে পড়ে, তখন এসব দোআ’ পাঠ করলে আল্লাহ সুবহানাহু
ওয়াতাআ’লা তার চিন্তা ও দুঃখ দূর করে দেন। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা তাঁর নবীকে উদ্দেশ করে বলেন-যখন
কাফিরদের কথা শুনে আপনার বুকে সংকীর্ণতা সৃষ্টি হয় ও আপনি দুঃখিত হনঃ
﴿وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّكَ يَضِيقُ صَدْرُكَ
بِمَا يَقُولُونَ﴾﴿فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُن مِّنَ السَّاجِدِينَ﴾
﴿وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّىٰ يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ﴾
“আমি অবশ্যই জানি, তারা যা
বলে তাতে তোমার বুক সংকুচিত হয়। অতএব, তুমি তোমার
প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ কর এবং সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। আর তোমার প্রতিপালকের ‘ইবাদাত করো-যতক্ষণ না তোমার কাছে নিশ্চিত
জ্ঞান (মৃত্যু) এসে যায়।” (আল হিজরঃ
৯৭-৯৯)
এজন্য আল্লাহ তাআ’লার তাসবীহ তথা আল্লাহর প্রশংসা করা ও তার যিকির করা হল এমন একটি কাজ যা দুঃখ
এবং চিন্তা দূর করে দেয়।
একটি প্রসিদ্ধ তাসবীহ এর উদাহরণঃ
হযরত ইউনুস আ. এর দোয়া। তিনি যখন মাছের পেটে ছিলেন, তখন বিপদ আপদের
দোয়া পড়লেনঃ
﴿لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ
إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ﴾
“তুমি ছাড়া নেই কোন ইলাহ, তুমি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালেমদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত।” (আল আম্বিয়াঃ ৮৭)
বিপদ আপদে আরো কিছু দোআ’ রয়েছে। যেমনটা হযরত উম্মে সালামা রা. বর্ণিত হাদীসে রাসূল সা. বলেছেনঃ কোন মুসলমান
যখন কোন বিপদে পড়ে, তখন তাকে আল্লাহ যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে
বলেঃ ﴿إِنَّا
لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ﴾ “নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে তার দিকেই।” (আল বাক্বারাহঃ ১৫৬)
اللَّهُمَّ أْجُرْنِي في مُصِيبَتِي، وأَخْلِفْ لي
خَيْرًا مِنْها، إلَّا أخْلَفَ اللَّهُ له خَيْرًا مِنْها
হে আল্লাহ! আমাকে আমার এই বিপদে পুরস্কৃত করুন, এবং অন্য কোনো উত্তম কিছু দিয়ে এর স্থলে আমাকে দান করুন-আল্লাহ
তাআ’লা সত্যিই তার জন্য তার বিপদের জায়গায় আরও উত্তম
কিছু দিয়ে প্রতিদান করেন। (মুসলিম)
এই হাদীসের বর্ণনাকারী উম্মে সালামাহ রা. বলেনঃ
فَلَمَّا ماتَ أبو سَلَمَةَ، قُلتُ: أيُّ
المُسْلِمِينَ خَيْرٌ مِن أبِي سَلَمَةَ؟ أوَّلُ بَيْتٍ هاجَرَ إلى رَسولِ اللهِ
صَلَّى اللَّهُ عليه وسلَّمَ، ثُمَّ إنِّي قُلتُها، فأخْلَفَ اللَّهُ لي رَسولَ
اللهِ صَلَّى اللَّهُ عليه وسلَّمَ
“যখন আবু সালামা রা. মৃত্যুবরণ করলেন, আমি বললামঃ
মুসলমানদের মধ্যে আবু সালামার চেয়ে উত্তম কে আছে? তিনি হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি রাসূলুল্লাহ
সা. এর সঙ্গে হিজরত করেছিলেন। তারপরও আমি এই দোয়াটি বললাম। ফলে আল্লাহ
সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমাকে তাঁর পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ সা. কে দান করলেন।”
(ড. আব্দুল্লাহ আল খাতির রাহি. রচিত “আল হুজন ওয় আল ইকতিয়াব” গ্রন্থের ভাবধারা অবলম্বনে
রচিত)

0 Comments