দূঃখ ও বিষন্নতাঃ কুরআন
ও সুন্নাহর আলোকে
পর্বঃ ৪
ডিপ্রেসনের চিকিৎসা
আমরা যখন বিষন্নতা ও বিষণ্ণতা সম্পর্কিত বিষয়টি
আলোচনা করেছি, তখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে যে,
ডিপ্রেসনের চিকিৎসা কি?
কুরআন ও সুন্নাহতে দুঃখ ও বিষন্নতার প্রতিরোধ
ও চিকিৎসা রয়েছে। বিশেষ করে যে দূঃখ ও
বিষন্নতা বাহ্যিক কারণে হয়ে থাকে। এটি
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য রহমত; কেননা
তিনি কুরআনকে মুমিনদের জন্য শিফা (চিকিৎসা) ও রহমত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। বিধায় মুমিনদের করণীয় হলো কুরআন এবং প্রিয়
নবী সা. এর সুন্নাহর দিকে ফিরে আসা-যাতে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে সুখ
ও প্রশান্তি লাভ করতে পারে । আর এটা
তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন ডিপ্রেসন এমন কোন মাসনিক রোগ না হয়-যা চিকিৎসা ছাড়া
প্রতিকার সম্ভব নয়। যদিও কুরআন সুন্নাহতে মানসিক রোগেরও চিকিৎসা
রয়েছে।
একঃ আক্বীদাহগত চিকিৎসা
ডিপ্রেসন প্রতিরোধ ও এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে
আক্বীদাহর বড় ধরণের প্রভাব রয়েছে। আক্বীদাহ শব্দটি অনেক শুনা যায়। কিন্তু বেশীরভাগ মানুষই জানে না
আক্বীদাহ শব্দের প্রকৃত অর্থ কি, এর দাবী কি এবং এর ফলাফল কি?
একই ভাবে মানুষের অনুভূতি আর আচরণেও আক্বীদাহর
গভীর প্রভাব রয়েছে। এ পর্যায়ে এর কিছু দিক এ
পর্যায়ে উপস্থাপন করা হলো। একই
সাথে এসব ডিপ্রেসনের প্রতিরোধ ও তার চিকিৎসায়
কীভাবে প্রভাব ফেলে,
তা তুলে ধরা হলোঃ
ক. তাক্বদীর ও আল্লাহর ফায়সালাঃ
আমাদের আক্বীদাহ হলোঃ আমরা মুসলিম। তাক্বদীর ও আল্লাহর ফয়সালার বিশ্বাস আমাদেরকে কঠিন
দূঃখ-কষ্ট থেকে রক্ষা করে। ইবনে
আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল সা. উক্তি উদ্বৃত্ত করা হয়েছে যে, নবী সা.
বলেছেনঃ জেনে রেখো!
যদি সমগ্র জাতি তোমার উপকার করার জন্য একত্রিত হয়, তারা তোমার
উপকার করতে পারবে না-শুধুমাত্র সেইটুকু যা আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করতেও একত্রিত হয়, তারা তোমার
ক্ষতি করতে পারবে না-শুধুমাত্র যা আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। (তিরমিযি)
আরেকটি বর্ণনায় এসেছেঃ জেনে রাখো, যা তোমার কাছে ঘটেনি তা তোমার কাছে আসতেই পারত না এবং যা তোমাকে এসেছে তা কখনো তোমার কাছে এড়িয়ে যেতে পারত না। (আবু দাউদ)
যখন মানুষ জানতে পারে যে সব কিছু আগেই নির্ধারিত
ও লেখা রয়েছে, তখন সে দুঃখ পায় না। যখন মানুষ জানে যে তার চারপাশের
মানুষরা তার ক্ষতি বা উপকার করতে পারে, বরং শুধু আল্লাহ নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী
সে দূঃখ পাবে। তখন মানুষ কীভাবে দুঃখ পাবে? তাহলে কেন
চিন্তা করবে? কেন এত বেশি দুঃখ করবে?
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বলেনঃ
﴿مَآ أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍۢ فِى ٱلْأَرْضِ
وَلَا فِىٓ أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِى كِتَـٰبٍۢ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَآ ۚ
إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٌۭ﴾﴿لِّكَيْلَا تَأْسَوْا۟ عَلَىٰ مَا
فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا۟ بِمَآ ءَاتَىٰكُمْ ۗ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ
مُخْتَالٍۢ فَخُورٍ﴾
“পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যে কোনো বিপদ আসবে না, কিন্তু তা
পূর্বেই একটি পুস্তকে (লিখে) রেখেছে। নিশ্চয়ই তা আল্লাহর কাছে সহজ। যেন তোমরা যা হারিয়েছ তা নিয়ে দুঃখ করো না এবং যা তোমাদের দেওয়া হয়েছে তাতে
আনন্দ করো না। আর আল্লাহ গর্বিত ও অহংকারীকে
পছন্দ করেন না।” (আল হাদীদঃ ২২-২৩)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সাইয়েদ কুতব রাহি. যা
বলেছেন, তার সারকথা হলোঃ
“দর্শন ও অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি, অনাদিকাল ও চিরন্তন কালের ধারণা এবং ঘটনাগুলোকে তাদের যথাযথ স্থান ও পরিমাপে আল্লাহর স্থির পরিকল্পনায়
দেখার মানসিকতা, সবকিছু মিলে আত্মাকে বিস্তৃত, বৃহত্তর এবং অধিক স্থিতিশীল ও ধৈর্যশীল করে তোলে সাময়িক ঘটনাবলোর মুখোমুখি হতে।”
তিনি আরো বলেনঃ মানুষ যখন নিজেকে অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং ঘটনাগুলোকে এমন কিছু সাময়িক
ব্যাঘাত হিসেবে দেখে যা তার ছোট ছোট অস্তিত্বের সঙ্গে সংঘর্ষ করছে, তখন সে অস্থির
হয় এবং ঘটনাগুলোকে অবমূল্যায়ন করে। কিন্তু যখন সে তার ধারণা ও অনুভূতিতে স্থির হয় যে সে নিজেই এবং তার মাধ্যমে ঘটে
যাওয়া ঘটনাগুলো এবং অন্যের মাধ্যমে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এবং সমগ্র
পৃথিবী একটি বড়ো অস্তিত্বের অণু অর্থাৎ এই অস্তিত্ব, তখন সে ভাগ্যের
সব অবস্থানে সমান শান্তি ও নিশ্চয়তা অনুভব করে। সে হারানো কিছুর জন্য হতাশ হয় না-যা তাকে দুর্বল করে এবং তার
মানসিক স্থিতি নড়বড়ে করে এবং অর্জিত সাফল্যের জন্য অতিরিক্ত
আনন্দিতও হয় না-যা তাকে বিভ্রান্ত করে। বরং সে আল্লাহর ভাগ্যের সঙ্গে সম্মতি ও সন্তুষ্টিতে অগ্রসর হয়-যেমনটি জ্ঞানী
ব্যক্তি স্বীকার করে যে যা ঘটে তা অবশ্যই হওয়া উচিত।
এটি সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মিলে যায়। কারণ এতে কারণ গ্রহণ, পরিশ্রম
করা, প্রচেষ্টা চালানো,
সমস্যা ও সংঘর্ষ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা এবং দুঃখ ও বিষন্নতা
এড়ানোর কারণগুলো দূর করার জন্য কাজ করার কথা বলা হয়েছে। অথবা যখন এসব ঘটে যাওয়ার পরে তা কমানোর জন্য তুলনা ও চিকিৎসার
মাধ্যমে কাজ করা হয়, তা বলা হয়েছে।
এখানে সুন্দর ও কোমল কথাগুলো বলার পর যা
উল্লেখ করা প্রয়োজন, তা হলোঃ কিছু মানুষ হয়তো কোন ব্যবসায় অর্থ হারায় বা সে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলে অথবা সে সন্তান
হারা হয়, কিংবা চাকরি বা মর্যাদা হারিয়ে ফেলে; তখন সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়। যদি সে এই
বিষয় এবং এই বিপর্যয়টি কল্পনা করে যে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাবে পূর্বনির্ধারিত, তাহলে সে অতীতে ঘটে যাওয়া ব্যাপারে দুঃখ পাবে না। যেমনটা কুরআনে
হাকীমের সূরা লোকমানে বলা হয়েছেঃ ﴿لِّكَيْلَا
تَأْسَوْا۟ عَلَىٰ مَا فَاتَكُمْ﴾ (যেন তোমরা
তোমাদের থেকে যা চলে গেছে সে বিষয়ে দুঃখ না পাও।) এবং এর বিপরীতে তাকে খুব বেশি আনন্দও করা উচিত
নয় ﴿وَلَا
تَفْرَحُوا۟ بِمَآ ءَاتَىٰكُمْ﴾ (তোমাদেরকে যা দেওয়া হয়েছে তাতে খুব বেশি আনন্দিত হয়ো না।) কারণ যা কিছু তাকে
দেওয়া হয়েছে তাও পূর্বনির্ধারিত, এবং অতিরিক্ত আনন্দ অহংকার, অতিমাত্রার আত্মগর্ব
ও ঘামপোষণ নিয়ে আসতে পারে إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍۢ فَخُورٍۢ﴾ (নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও আত্মপ্রশংসাকারী কাউকে পছন্দ করেন না।) (আয়াতঃ ১৮)
এখানে বুঝানো হয়েছেঃ অতিরিক্ত খুশি না হওয়াই ভালো, কারণ সেটা মানুষকে অহংকার এবং গর্ব থেকে দূরে রাখে। একই সময়ে, মানুষ বুঝতে পারে যে এই আনন্দের বিষয়টিও
একদিন হারিয়ে যেতে পারে। আর যদি সে অতিরিক্ত খুশি হয়ে সেই জিনিসটি পেয়ে
থাকে,
তাহলে হারানোর সময় সে তেমনি ভীষণ দুঃখও পাবে।
কিন্তু যদি মানুষ এটাকে আল্লাহর নিয়ামতের অংশ
হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে সে সেটা স্বস্তি
ও মানসিক ভারসাম্যের সঙ্গে মেনে নেবে এবং এটাই মূল ফলাফল। যখন মানুষ তার অনুভূতিতে ভারসাম্য বজায় রেখে
বিপদ বা আনন্দ গ্রহণ করে, তখন সে জীবনে শান্তি
এবং স্থিরতা পায়।
খ. আখেরাতের প্রতি ঈমানঃ
যিনি পরকালে বিশ্বাস করেন, তিনি জানেন এই জগতের জীবন খুবই ছোট এবং এটি তুচ্ছ; এই জীবন কিছুই নয়।
যখন কেউ প্রিয়জনকে হারায়, তখন সে জানে যে পরকালে সে তার সাথে আবার মিলিত হবে (ইনশাআল্লাহ)
। যারা পরকালে বিশ্বাস করে, তারা মনে করে এই
দুনিয়া আল্লাহর নিকট পরকালের তুলনায় কিছুই নয়। তাই যখন
তারা এই ছোট দুনিয়ার কোনো অংশ হারায়, তখন তারা অতিরিক্ত শোকাহত হয় না এবং রাসূল সা. এর সেই উক্তিকে স্মরণ করেঃ
“যদি দুনিয়া আল্লাহর কাছে মশার পাখার পালক সমানও মূল্যবান
হতো,
তবে একজন কাফেরকেও দুনিয়া থেকে এক গ্লাস পানি পান করতে দিতেন
না।”
(তিরমিযি)
ঈমান থাকার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণগুলোর মধ্যে
একটি হলো পরকালের প্রতি বিশ্বাস-যা দুঃখ হ্রাস
করে এবং মুমিনকে সান্ত্বনা দেয়। যেমনটা নবী সা. এর পুত্র ইব্রাহীমের মৃত্যুর ঘটনা থেকে জানা
যায়। রাসূলুল্লাহ
সা. তাঁর পুত্র ইব্রাহীমেরর মৃত্যুতে দুঃখিত হয়েছিলেন এবং বলেছিলেনঃ
“চোখে অশ্রু ঝরে এবং হৃদয় শোকাহত হয়। কিন্তু আমরা এমন কিছু বলি না যা আল্লাহকে
ক্রুদ্ধ করে। আর যদি এটা না হতো-এবং এখানে একটি সত্য ওয়াদা
এবং একটি সামগ্রিক ওয়াদা রয়েছে যে পরবর্তী আমাদের অনুসরণ করবে পূর্ববর্তীকে-তবে আমরা
তোমার প্রতি গভীর শোক অনুভব করতাম ও ইব্রাহিম এবং আমরা তোমার
জন্য দুঃখিত।” (বায়হাকী)
অর্থাৎ যদি আমরা আল্লাহর সঙ্গে আখেরাতের দিন বিশ্বাস
না করতাম,
তবে আমরা তোমার জন্য গভীর দুঃখ করতাম।
অতএব, পরকালে বিশ্বাস রাসূলুল্লাহ সা.এর জন্য এক ধরনের রক্ষা কবচ ছিল। যদি আমাদের পরকাল সম্পর্কে বিশ্বাস দৃঢ় ও সত্য হয়, তাহলে তা আমাদেরকে জীবনের ঘটনাগুলো সহজভাবে গ্রহণ করতে সাহায্য
করবে এবং সেগুলোর নেতিবাচক প্রভাব থেকে আমাদের রক্ষা করবে।
গ. আল্লাহর নাম ও গুণাবলীতে বিশ্বাসঃ
কিছু মানুষ মনে করেন আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর প্রতি
ঈমান শুধু একটি চিন্তাগত বা আধ্যাত্মিক বিষয়। অর্থাৎ তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ
তিনি মালিক বা বাদশাহ, আইনদাতা, শক্তিমান, সার্বভৌমত্বের
অধিকারী,
দানশীল...এই ধরণের কিছু। কিন্তু আল্লাহর এই গুণাবলীর প্রতি ঈমান
মুসলমানের জীবনে কোনো বাস্তব প্রভাব ফেলে না। এজন্য তারা
তাদের ঈমান থেকে যথাযথ এবং প্রকৃত ফায়দামন্দ হয় না।
কিন্তু সত্য কথা হলো, আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর প্রতি ঈমান মানব জীবনে বড় ধরণে প্রভাব
রয়েছে এবং বাস্তব ফলাফল থাকে। একজন মুসলমান যিনি বিশ্বাস করেন
যে, আল্লাহ হচ্ছেন মালিক, তিনি বুঝতে পারেন
আল্লাহর সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে দান করার এবং দান না করার কিংবা দান ফিরিয়ে নেয়ার। তাই একজন মুমিন
কখনো আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর কোন ধরণের বিরোধ করবে না বা তাঁর সিদ্ধান্তে কোন
ধরণের সন্দেহ করবে না।
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ঈমান রাখে যে, তিনি হাকীম-সেই আল্লাহ কোনো কিছুই নিরর্থক নির্ধারণ করেন না, বরং প্রতিটি বিষয়ের পেছনে রয়েছে তার কোনো না কোনো হিকমত-সে ব্যক্তি জীবনের ঘটনার
সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে। সে জানে, এসব ঘটনার মধ্যে নিশ্চয়ই তার জন্য কল্যাণ রয়েছে, যদিও মানুষের সীমিত জ্ঞান দিয়ে তা তখন বোঝা না। তবে পরবর্তীতে হয়তো মানুষ সেই হিকমত অনুধাবন করতে সক্ষম হয় অথবা আংশিক উপলব্ধি
করে।
এজন্য আমরা উদাহরণ হিসাবে কুরআনে বর্ণিত একটি
কাহিনী উল্লেখ করতে পারি-এটি খিজির আ. ও মূসা আ. এর কাহিনী, যা সূরা
আল কাহফে উল্লেখ করা হয়েছে। এই কাহিনীর ঘটনাপ্রবাহে একটি ঘটনা ছিল এমনঃ খিজির আ. একটি বালককে হত্যা করেন। এতে মূসা আ. বিস্মিত হন এবং তীব্রভাবে প্রতিবাদ
জানিয়ে বলেনঃ
﴿أَقَتَلْتَ نَفْسًا زَكِيَّةً بِغَيْرِ
نَفْسٍ لَّقَدْ جِئْتَ شَيْئًا نُّكْرًا﴾
“আপনি কি একটি পবিত্র প্রাণ হত্যা করলেন, অন্য কোনো
প্রাণের বিনিময় না হয়ে?
আপনি তো এক ভয়ঙ্কর কাজ করেছেন!” (আল কাহফঃ ৭৪)
এরপর খিজির আ. মূসা আ. কে সেই বালককে হত্যার কারণ
ব্যাখ্যা করে বলেনঃ
﴿وَأَمَّا الْغُلَامُ فَكَانَ أَبَوَاهُ
مُؤْمِنَيْنِ فَخَشِينَا أَن يُرْهِقَهُمَا طُغْيَانًا وَكُفْرًا﴾ ﴿فَأَرَدْنَا
أَن يُبْدِلَهُمَا رَبُّهُمَا خَيْرًا مِّنْهُ زَكَاةً وَأَقْرَبَ رُحْمًا﴾
“আর সেই বালক-যার পিতা-মাতা ছিল মুমিন; সুতরাং আমরা আশঙ্কা করেছিলাম, সে তাদেরকে অবাধ্যতা ও কুফরীতে ফেলে দেবে। অতএব আমরা চেয়েছিলাম যে, তাদের রব তাদেরকে তার বদলে উত্তম পবিত্র চরিত্রসম্পন্ন ও অধিক
রহমদীল সন্তান দান করুন।” (আল কাহফঃ ৮০-৮১)
মুসা আ. এবং এ ছেলের পিতামাতার কাছেও দৃশ্যত
এমনটা মনে হয়েছিল যে, ছেলেটিকে হত্যা করার কাজটা ছিল বড় ধরণের বিপদ বা মুসিবত। অথচ বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা
ঐ ছেলেটির হত্যার মাধ্যমে তার পিতামাতার প্রতি রহম নাযিল করেছিলেন। কারণ তারা ছিলেন মুমিন এবং
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা তাদেরকে ভালবাসতেন। আল্লাহ জানতেন যে, তাদের জন্য কোনটি ভাল,
তাই তিনি ছেলেটির মৃত্যুর ফায়সালা করেছিলেন।
বাস্তব জীবনের এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যা প্রথমে
মানুষের কাছে বিপদ এবং দূর্ভাগ্য বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সব ঘটনা আল্লাহর
হিকমাতপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও রহমতের নিদর্শন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। আর এই সব ঘটনাবলী প্রমাণ
করে যে, প্রতিটি মুসিবত আর বিপদের পিছনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ার একটি কল্যাণকর
উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। এই ধরণের কিছু গল্প পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হলোঃ
১. হিজরী ১৪০০ সাল। সৌদী আরবের রিয়াদ বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের
পর একটি বিমান আগুনে পুড়ে গেলে ঐ দূর্ঘটনায় ৩০১জন যাত্রী মারা যায়। ঐ বিমানের একজন সিডিউল
যাত্রী-যাকে রিয়াদের একটি মেন্টাল ডিজিজ ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়-সে বলেছিলঃ আমি ঐ ফ্লাইটের
একজন যাত্রী ছিলম। আমি বিমানবন্দরের পার্কিংয়ে গাড়ী পার্কিং করার সময় ভুল করে গাড়ির চাবি ভিতরে
রেখে দিই। যার কারণে আমি কিছু সময় চাবি বের করার উপায়
খুঁজতে থাকি, আর চিন্তার মধ্যে থাকি যে, এইতো
ফ্লাইটটা মিস হয়ে যাবে। পরে যখন চাবি বের করলাম এবং প্যাসেঞ্জার
লাউঞ্চে পৌঁছালাম, তখন দেখলাম বিমানটি
উড়ে গেছে-মানে আমি ফ্লাইট মিস করেছি। এতে আমার কিছুটা কষ্ট হলো। এরপর হঠাৎ শুনি, বিমানটি আগুনে পুড়ে
গেছে। এরপর ওই ব্যক্তি বলেনঃ
আলহামদুলিল্লাহ! যিনি আমাকে নতুন
জীবন দান করেছেন।
২. একই বিমানের অন্য একজন যাত্রীর ঘটনা। তিনি ইমিগ্রেশন শেষ করে
বোডিং পাস নিয়ে ওয়েটিং এরিয়াতে বসেছিলেন। বসে থাকতে থাকতে তার ঘুম এসে যায় এবং উনি গভীর ঘুমে চলে
যান। এদিকে
তার নাম ধরে বারবার ঘোষনা করা হচ্ছে, কিন্তু তিনি ঘুমে থাকার কারণে শুনতে পাননি। এমতাবস্তায় বিমান ডোর
ক্লোজ করে উড্ডয়নের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। যখন তার ঘুম ভাঙ্গে তখন তিনি কাউন্টারে গিয়ে কর্তব্যরত
ব্যক্তিদেরকে বিমানে ওঠার ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। এমতাবস্তায় তিনি প্রচন্ড
রকমের রেগে যা, খুব বিরক্ত হয়ে বিমানের কর্মচারীদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় বিমানটি উড্ডয়ন করে এবং পনেরো মিনিট পর দেখা গেল বিমানটি রানওয়েতে
ফিরে এসেছে এবং বিমানটিতে আগুন দাউদাউ করছে। যাত্রীদের যা হবার হয়ে গেছে। তখন তিনি বিস্ময় ও স্তব্ধতার সাথে সবকিছু
দেখতে থাকনে।
আপনি এই গল্প গুলো এবং জীবনে বাঁকে বাঁকে ঘটে
যাওয়া বা শোনে যাওয়া এমন ঘটনা গুলো স্মরণ করবেন। যদি কখনও আপনার বিমানও মিস হয়ে যায়, কিংবা
আপনার গুরুত্বপূর্ণ কোন সম্পদ হারিয়ে যায়, চাকুরী বা অন্য কিছু চলে যায়-তখন আপনাকে
বুঝতে হবে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আপনার জন্য এরচেয়ে ভাল কিছু ঠিক করে
রেখেছেন। আর এভাবে আল্লাহর নাম ও সিফাত এর উপর ঈমানের একটি অংশ অর্জন করা যাবে।
(ড. আব্দুল্লাহ আল খাতির রাহি. রচিত “আল হুজন ওয় আল ইকতিয়াব” গ্রন্থের ভাবধারা অবলম্বনে
রচিত)
ডিপ্রেসনের চিকিৎসা নিয়ে আরো কথা রয়েছে, যা জানতে পারবেন আগামী পর্বে। আর পূর্ববর্তী পর্ব গুলো পড়ার জন্য নির্দিষ্ট পর্বের উপর ক্লিক করুনঃ প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব এবং তৃতীয় পর্ব

0 Comments