দূঃখ ও বিষন্নতাঃ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে-মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম (পর্ব-৩)

 


দূঃখ ও বিষন্নতাঃ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে

পর্বঃ

ডিপ্রেশন বা বিষন্নতা রোগ

প্রথমতঃ ডিপ্রেশনের লক্ষণ

মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে ডিপ্রেশনের লক্ষণসমূহ যেভাবে দেখা হয়ে থাকে, তাহলোঃ দুঃখ ও অস্থিরতা অনুভব করা অনেকে এই ধরণের অবস্থাকে ‘বুকে চেপে ধরা’ বা ‘অবসাদে বুক ভরে আসা’ বলে থাকেন এর সাথে কান্না চলে আসা, খাওয়ার ইচ্ছা কমে যাওয়া এবং কোন কিছু করার আগ্রহ কমে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ প্রকাশিত হয়

এ কারণে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীর উৎপাদন ক্ষমতা বা প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি কমে  যায় মনোযোগ  হ্রাস পায়, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা শুরু হয় এবং সে ভাবতে শুরু করে যে, এই জীবন অর্থহীন, সে নিজেও বেকার-তুচ্ছ, তার কোনো মূল্য নেই, সে এই দুনিয়ায় বাস করার যোগ্য নয় এতে করে সে মৃত্যুকামনা করতে পারে এবং আত্মহত্যার চিন্তাও করতে পারে একই সাথে ঘুমের সমস্যাও দেখা দেয় এবং ওজন কমতে থাকে

মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে, আর পুরুষদের ক্ষেত্রে যৌন দুর্বলতা দেখা দিতে পারে  এমনকি রোগী কিছু নির্দিষ্ট অসুস্থতা আছে বলে কল্পনাও করতে পারে, যদিও বাস্তবে তা নেই

এই ধরণের ব্যক্তি অদ্ভুত শব্দ শুনতে পায়, যা তার সাথে কথা বলে এবং তাকে দোষারোপ ও ডাকে রোগী এই শব্দগুলোর উৎস নির্ধারণ করতে পারে না, এগুলো কেবল তার অনুমান মাত্র এগুলোকে হ্যালুসিনেশন বলা হয় এবং এটি বিষণ্ণতার রোগে বিরল

এমতাবস্তায় সে নিজেকে দোষ দেয় এবং অতীতের তুচ্ছ কিছু কাজের জন্য নিজেকে গভীর অপরাধী মনে করে, যা তাকে কাজ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে

স্বতঃসিদ্ধ কথা হলো, অপরাধবোধ থাকা প্রয়োজন; যদি এই বোধ মানুষকে উৎপাদনশীলতা, তাওবা এবং অগ্রগতি অর্জনে প্রেরণা দেয়আর যে অপরাধবোধ মনোবল কমিয়ে দেয় এবং কাজ থেকে বিরত রাখে; সেটি ডিপ্রেসন বা বিষন্নতার একটি লক্ষণ-যা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে

ডিপ্রেসন বা বিষন্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তি মাঝে মাঝে অন্য কাউকে হত্যা করতেও পারে এবং এই ধরনের হত্যা সাধারণ হত্যার মতো নয় কারণ বিষন্ন ব্যক্তি মনে করে যে, সে যা করেছে তা ঐ ব্যক্তির জন্য এক ধরনের দয়া-আর সাধারণত সেই ব্যক্তি হয় তার স্ত্রী বা সন্তানরা উদাহরণস্বরূপ, কিছু সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয় এমন শিরোনামেঃ ‘এই খবরটি পড়বেন না’ তাতে লেখা থাকে, এক ব্যক্তি তার পাঁচ সন্তানকে হত্যা করে, তারপর স্ত্রীকে, এরপর নিজেকেও হত্যা করে

এটি সাধারণত খুবই বিরল ঘটনা এবং ঘটে তখনই, যখন ডিপ্রেসনে আক্রান্ত ব্যক্তি চরম হতাশা ও আশাহীনতায় ভোগে সে মনে করে, নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া এবং অন্যদেরও এই দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি দেওয়াই দয়াপরায়ণতা-আর এটা তার মানসিক অবস্থা তাকে বিশ্বাস করায় এটি আত্মহত্যারই একটি রূপ, যার সঙ্গে অন্যদের জীবন কেড়ে নেওয়া যুক্ত হয়ে যায়

এই ধরনের খুনি সাধারণত ডিপ্রেসন বা বিষন্নতায় আক্রান্ত থাকে সে নিজে মনে মনে বলেঃ নিশ্চয়ই এই দুনিয়া কিছুই নয়, এতে কেবল ক্ষতি আর দুঃখ-এটা এমন কিছু নয়, যার জন্য মানুষ বাঁচতে চায়

তাই সে ভাবেঃ আমার সন্তান ও স্ত্রীকে দয়া করে আমি হত্যা করব; কারণ আমি চাই না তারা এই কষ্টের জীবন যাপন করুক

অতঃপর সে তাদের হত্যা করে এবং নিজেকেও হত্যা করে

দ্বিতীয়তঃ ডিপ্রেসনের কারণসমূহ

ডিপ্রেসনের বাহ্যিক কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আভ্যন্তরীণ কারণ। যেমনঃ

. বাহ্যিক কারণসমূহঃ এমন সব কারণ যা মানুষের নিজের অন্তরগত নয়, বরং তার বাইরের পরিবেশ থেকে উদ্ভূত এর মধ্যে রয়েছেঃ

১. পরিবেশগত কারণঃ যেমন দুনিয়ায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা উদাহরণস্বরূপঃ যখন কেউ তার কোনো প্রিয় জিনিস হারায়-তা মানুষ হতে পারে, সম্পদ হতে পারে বা সামাজিক মর্যাদা হতে পারে-তখন সেই ব্যক্তি এ ক্ষতির প্রতিক্রিয়ায় কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে যেমনঃ

প্রথম ধাপঃ অস্বীকার ও অবিশ্বাসের ধাপ এই পর্যায়ে মানুষ ঘটে যাওয়া ঘটনাকে বিশ্বাস করতে চায় না সে বলেঃ “আমি তোমাদের কথা বিশ্বাস করতে পারছি না” অথবা “আমার মনে হয় না এমন কিছু ঘটেছে, তোমরা যাও... ভালো করে নিশ্চিত হও” এটি সে নিজের উপর বিপদটি হালকা করার জন্য করে

দ্বিতীয় ধাপঃ অনুভূতি স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার ধাপ অর্থাৎ মানুষ দুঃখ অনুভব করে না আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন, যখন কারো একান্ত কাছের কেউ মারা যায়, তখন তারা দূঃখিত হয় না। বরং কিছুই হয়নি, এমনটাই প্রতীয়মান হয়। আর এইঅবস্থা সাধারণত দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় না

তৃতীয় ধাপঃ কান্না করা এবং বুকের অবসাদের ধাপ এই সময় খাদ্য গ্রহণ, যৌনতা বা অন্য কোন বিষয়ে কোনো আগ্রহ থাকে না সাথে সাথে অন্যান্য মৃদু বিষন্নতার উপসর্গও থাকে-যেমনটা আমরা ইতিপূর্বে একবার উল্লেখ করেছি

চতুর্থ ধাপঃ বিষয়টি মেনে নেওয়ার এবং বাস্তবতা গ্রহণ করে নেয়ার ধাপ। জীবনের সাথে চলতে থাকা; এই সব ধাপের মোট সময়সীমা সাধারণত ছয় মাসের বেশি হয় না এটি সমাজ থেকে সমাজে ভিন্ন হতে পারে

যদি কোনো ব্যক্তি এক বছর বা দুই বছর আগে তার কোনো প্রিয়জনকে হারিয়ে থাকে এবং যতবার সে তাকে স্মরণ করে কাঁদে এবং উত্তেজিত হয় এবং তার অবস্থা এতটাই গুরুতর হয় যে সে তার চাকরি ছেড়ে দেয় এবং নিভৃত থাকে; তাহলে এটি এক ধরনের ডিপ্রেসন বা বিষন্নতা

এই ক্ষেত্রে সাধারণত বিষন্নতার লক্ষণগুলো স্পষ্ট দেখা যায় আর যদি কেবলমাত্র হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির স্মরণ হলে কাঁদে, কিন্তু ব্যক্তির অন্যান্য সব বিষয় স্বাভাবিক থাকে তাহলে তা সাধারণ একটি ব্যাপার এবং এটা কোনো রোগ নয়

. ব্যবহৃত ওষুধের কারণঃ গবেষণা ও পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে কিছু ওষুধ মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়; যার ফলে এই ওষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ডিপ্রেসন বা বিষন্নতা দেখা দিতে পারে যেমন রক্তচাপের ওষুধ, হৃদপিণ্ডের দুর্বলতার ওষুধ এবং রিউমাটিজমের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ

৩. মাদকদ্রব্য গ্রহণের কারণঃ কিছু মাদকদ্রব্য নিজেই ডিপ্রেসন বা বিষন্নতার সৃষ্টি করে আবার কিছু মাদকদ্রব্য থেকে ব্যক্তি যদি আকস্মিকভাবে বিরত থাকে, তবেও ডিপ্রেসন বা বিষন্নতা হতে পারে যেমনঃ মদ্যপান ডিপ্রেসন বা বিষন্নতার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং এর ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকিও থাকে

এছাড়াও কিছু উদ্দীপক ওষুধ রয়েছে, যা কিছু তরুণ বা ট্রাক চালক দীর্ঘ পথ চলার সময় জাগ্রত থাকার জন্য গ্রহণ করে থাকে এই ওষুধে এমফেটামিন নামক পদার্থ থাকে যেসব ব্যক্তি এটি গ্রহণ করে থাকেন, যদি আকস্মিকভাবে সেগুলো বন্ধ করে দেয়, তবে তারা ডিপ্রেসন বা বিষন্নতায় ভুগতে পারেন ফলে তারা আবার এই ওষুধগুলো গ্রহণ করে ডিপ্রেসন বা বিষন্নতা কমাতে চায় এভাবেই আসক্তি সৃষ্টি হয় এবং ব্যক্তি এই চক্র থেকে বের হতে পারে না

খ. অভ্যন্তরীণ কারণসমূহঃ এমন সব কারণ যা বংশগতমস্তিষ্কের কোষের অভ্যন্তরীণ জৈবিক গঠন অথবা শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক রোগসমূহ যার মধ্যে রয়েছে যেমনঃ

১. বংশগত কারণসমূহঃ মেডিক্যাল গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, কিছু মানুষের মধ্যে ডিপ্রেসন বা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে এবং কিছু রোগীর আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বিষণ্ণতার সমস্যা দেখা যায় এটি প্রধানত বিভিন্ন কারণের মধ্যে একটি এবং এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি ডিপ্রেসন বা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত রোগীর আত্মীয় বা সন্তানেরাও অবশ্যই এই রোগে আক্রান্ত হবেন

২. অর্গানিক বা শারীরিক রোগসমূহঃ  যেমন থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি ডিপ্রেসন বা বিষণ্ণতার সৃষ্টি করে তেমনি ভিটামিনের অভাবও এই রোগের কারণ হতে পারে যেমনঃ ভিটামিন বি-১২।

৩. অজানা বা অপরিচিত কারণসমূহঃ মানুষ কখনও কখনও কোনো ধরণের স্পষ্ট কারণ ছাড়াও ডিপ্রেসন বা বিষন্নতায় আক্রান্ত হতে পারেমানে ডিপ্রেসনের কারণ রয়েছে, কিন্তু সে কারণ সমূহ এখনো চূড়ান্তভাবে আবিস্কৃত হয়নি তবে প্রাথমিক গবেষণায় কি কারণ তা জানা যায়

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ডিপ্রেসন বা বিষন্নতা কেবল বিপদ, মুসিবত, সমস্যায় আক্রান্ত হওয়া ও বাহ্যিক কারণ সমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এর বাহিরে আরো কারণ রয়েছে যেমনটা অনেক মানুষ যেমন ভুল ধারনা করে যে, যদি কেউ ডিপ্রেসনে আক্রান্ত হয়, তাহলে তা কেবল তার ঈমানের দূর্বলতা বা দ্বীনি জীবন যাপন না করার কারণে হয় তাই দুঃখের ওপর আরও দুঃখ আক্রান্ত হতে থাকে কারণ সে এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, যা সঠিক হওয়া জরুরী নয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডিপ্রেসন বা বিষন্নতা মাত্র একটি একক কারণে ঘটে না বরং অনেক গুলো কারণের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে সৃষ্টি হওয়া অবস্থার ফলস্বরূপ ডিপ্রেসন প্রকাশ পায়

ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি আমাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নিয়ে যায়, যা অনেক ডিপ্রেসন আক্রান্ত রোগীর সাথে ডাক্তাররা কথা বলার মাধ্যমে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন আর এটি অনেকের জন্য বিভ্রান্তিকর হয় কারণ কেউ কেউ এমন কিছু কাজ করে বসে, যেগুলো তারা হারাম মনে করে, ফলে তা করার কারণে তারা আরও বেশি চিন্তার মধ্যে নিপতিত হয়

এজন্য আমরা বলিঃ শরীয়তে কিছু বিষয় বৈধ আছে যেমন কিছু অঙ্গ-প্রতিক্রিয়া, অনুভূতি এবং অনিচ্ছাকৃত কাজ এসবের জন্য বান্দাকে জবাবদিহি করতে হবে না। যেমনঃ বুকে অস্বস্তি অনুভব করা, চোঁখের অশ্রু অথবা মনের মধ্যে আসা বিভিন্ন ভাবনা ও কল্পনা মানুষ এগুলোর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না তাই এগুলোর জন্য তাকে জবাবদিহিও করতে হবে না যেমনটা রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ

নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের এমন সকল বিষয়ের ক্ষমা করে দিয়েছেন, যা তারা মনে মনে চিন্তা করে যতক্ষণ না তা মুখে প্রকাশ করে বা তার ওপর আমল করে (বুখারী)

রাসূলুল্লাহ সা. একবার সাহাবীদের নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় সা’দ ইবনে উবাদাহকে দেখতে যান তখন তিনি কেঁদে ফেলেন সহাবীরাও তাঁর কান্না দেখে কাঁদতে থাকেন তখন তিনি বললেনঃ তোমরা কি শোন না? আল্লাহ চোঁখের অশ্রুর কারণে কিংবা হৃদয়ের দুঃখের কারণে শাস্তি দেন না বরং এই জিহবার মাধ্যমে তথা ভাষার দ্বারা শাস্তি দেন অথবা দয়া করেন অর্থাৎ যা মুখে বলা হয় তার উপর ভিত্তি করে (বুখারী ও মুসলিম)

মানুষ তখনই শাস্তি পায় যখন সে আল্লাহর অসন্তুষ্টিজনক কথা বলে এর চেয়ে বড় বিষয় হলো রাসূলুল্লাহ সা. এর ঘটনা তিনি তাঁর নাতির মৃত্যুর সময় উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেনঃ এটা তো রহমত, যা আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের হৃদয়ে স্থাপন করেছেন (বুখারী ও মুসলিম)

আর ইচ্ছাকৃত আচরণ-যা বান্দা নিজের ইচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তা কথা হোক বা কাজ-এর জন্য সে জবাবদিহি করবে যেমনঃ গালে আঘাত করা, কাপড় ছিঁড়ে ফেলা, মৃত্যু কামনা করে কথা বলাযেমনঃ “হায়! যদি আমি মরে যেতাম”, “হে আল্লাহ! আমার প্রাণ নিয়ে নাওঅথবা তাকদিরের ওপর আপত্তি করা বা বলাঃ “যদি আমি এমন করতাম, তাহলে এমন হতো”, যেন তাকদিরকে পরিবর্তন করতে চায়; অথবা শোক প্রকাশে বাড়াবাড়ি করা (নিয়াহা), আত্মহত্যা করা বা আত্মহত্যার চেষ্টা করা-এসব আচরণের জন্য বান্দা দায়ী হবে

এর প্রমাণ অনেক রয়েছে, তার মধ্যে কিছু হলোঃ

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে গালে চড় মারে, জামা ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহিলিয়াত যুগের আহবান করে (বুখারী)

তিনি আরো বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন নিজের উপর কোনো কষ্ট এসে পড়ার জন্য মৃত্যু কামনা না করে; কিন্তু যদি তাকে মৃত্যুর কামনা করতেই হয়, তাহলে বলুকঃ হে আল্লাহ, আমাকে জীবন দাও যদি জীবন আমার জন্য উত্তম হয় এবং আমাকে মৃত্যুর আওতায় নাও যদি মৃত্যু আমার জন্য উত্তম হয় (বুখারী)

খাব্বাব রা. এর একটি উক্তি বুখারী শরীফে উদ্বৃত হয়েছেঃ যদি নবী সা. আমাদের মৃত্যুর জন্য দোয়া করার নীতি না দিতেন, আমি মৃত্যুর জন্য দোয়া করতাম অর্থাৎ মুখ্য বিষয় হলো কাজ শুধুমাত্র চিন্তা করা নয়

আত্মহত্যা সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বলেনঃ

﴿وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا﴾

আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু (আন নিসাঃ ২৯)

বুখারী ও মুসলিমে আল্লাহ রাসূল সা. এর একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে নবী সা. বলেছেনঃ যে ব্যক্তি লোহার অস্ত্র দিয়ে নিজেকে হত্যা করে, সে জাহান্নামে সেই অস্ত্র হাতে নিয়ে নিজের পেটে ঘা দিতে থাকবে, চিরকাল সেখানেই থাকবে আর যে বিষপান করে নিজেকে হত্যা করে, সে জাহান্নামে সেই বিষ চুষতে থাকবে, চিরকাল সেখানেই থাকবে আর যে পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে নিজেকে হত্যা করে, সে জাহান্নামে বারবার লাফ দিতে থাকবে, চিরকাল সেখানেই থাকবে

আমরা এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই যা পাঠকের অজানা থাকতে পারে, আর তা হলোঃ আত্মহত্যাকারীর ব্যাপারে ধর্মীয় গ্রন্থে যে শাস্তির কথা বলা হয়েছে, তা মূলত সেইসব লোকদের জন্য যারা দায়িত্বশীলঅর্থাৎ যারা বুদ্ধি ও বিবেকসম্পন্ন এবং পূর্ণভাবে দায়বদ্ধ কারণ, কিছু কঠিন ডিপ্রেসন রয়েছে, যাকে বলা হয় “ডিপ্রেসিভ সাইকোসিস” বা “আলুজন/ভ্রম সহ বিষন্নতা”, এ অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তি সচেতন থাকেন না এবং তার দায়িত্ব মাফ করা হয় তার মানসিক অসুস্থতার কারণে যদি এমন কেউ আত্মহত্যা করে, তাহলে তার বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল তাই আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে, প্রত্যেক আত্মহত্যাকারীই শাস্তিযোগ্য

এজন্য, যদি ডাক্তারের কাছে এমন কোনো রোগী আসে যে এই মানসিক অবস্থায় ভুগছে, তাহলে তার দায়িত্ব মনোরোগ বিশেষজ্ঞের; তিনিই তার চিকিৎসা করবেন এবং প্রয়োজনে তাকে চিকিৎসা নিতে বাধ্য করবেন-কারণ সে সচেতন নয় কিন্তু যে ব্যক্তি সচেতন ও পূর্ণ বিবেকসম্পন্ন, তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত তার নিজের এবং তার কাজের জন্য তাকেই জবাবদিহি করতে হবে

এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য হলোঃ কিছু মানুষ আত্মহত্যার ব্যাপারে অত্যন্ত হালকাভাবে চিন্তা করে তাদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে ওষুধ খায়, যাতে সে মারা যায়এর মানে হলোঃ সে নিজেকে হত্যা করে কখনো এই চেষ্টা সফলও হয় এবং সে আত্মহত্যা করে বসে-আল্লাহ আমাদেরকে এ থেকে হেফাজত করুন

(ড. আব্দুল্লাহ আল খাতির রাহি. রচিতআল হুজন ওয় আল ইকতিয়াব” গ্রন্থের ভাবধারা অবলম্বনে রচিত)

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন আর দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


Post a Comment

0 Comments