দূঃখ ও বিষন্নতাঃ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে-মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম (পর্ব-৪) শেষ অংশ

 


দূঃখ ও বিষন্নতাঃ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে

পর্বঃ ৪-শেষ অংশ

ডিপ্রেসনের চিকিৎসা

চারঃ খারাপ পরিস্থিতি প্রত্যাশা করা ও খারাপ অবস্থায় পতিতদের দিকে নজর দেয়া

এ পর্যায়ে এমন একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দেবো, যা মনোরোগ বিশেষজ্ঞতরা ব্যবহার করেন অথচ আমাদের নবী মুহাম্মদ সা. অনেক অনেক আগে থেকে তার ব্যবহার করতেন আমরা সবাই জানি যে, হযরত খাব্বার ইবনে আরত রা. এর সেই বিখ্যাত হাদীস যা ইমাম বুখারী রাহি. সংকলণ করছেন আর তাহলোঃ যখন সাহাবায়ে কিরামগন মক্কার কাফেরদের দ্বারা কঠোর অত্যাচার নির্যাতনে শিকার হচ্ছিলেন এবং কঠিন যন্ত্রণা ভোগ করতেছিলেন এমন এক সময়ে হযরত খব্বার ইবনে আরত রা. রাসূলুলরাহ সা. এর নিকট আসলেন রাসূল সা. তখন কাবাঘরের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন খাব্বাব রা. প্রশ্ন করলেনঃ أَلَا تَسْتَنْصِرْ لَنَا؟ أَلَا تَدْعُو لَنَا؟ (আপনি কি আমাদের সাহয্য করবেন না? আপনি কি আমাদের জন্য দোআ’ করবেন না?) তখন আল্লাহর রাসূল সা. বললেনঃ

قَدْ كانَ مِنْ قَبْلِكُمْ يُؤْخَذُ الرَّجُلُ فَيُحْفَرُ لَهُ فِي الأَرْضِ، فَيُجْعَلُ فِيهَا، ثُمَّ يُؤْتَى بِالْمِنْشَارِ فَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ، فَيُجْعَلُ نِصْفَيْنِ، يُمْشَطُ بِأَمْشَاطِ الحَدِيدِ ما دُونَ لَحْمِهِ وَعَظْمِهِ، ما يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ، وَاللَّهِ لَيُتِمَّنَّ اللَّهُ هَذَا الأَمْرَ، حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنْ صَنْعَاءَ إِلَى حَضْرَمَوْتَ، لا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ وَالذِّئْبَ عَلَى غَنَمِهِ، وَلَكِنَّكُمْ تَسْتَعْجِلُونَ.

তোমাদের আগের যুগের লোকদের ধরে মাটিতে গর্ত খুঁড়া হতো তারপর সেখানে ফেলে দেয়া হতো তারপর মাথার উপর করাত রাখা হতো অতঃপর তাকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হতো লোহার চিরুণী দিয়ে মাংস ও হাড্ডি খোঁচানো হতো-এরপরও তারা কেউ দ্বীন থেকে দূরে চলে যেতো না আল্লাহ কসম! নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা (ইসলামের বিজয়ের মাধ্যমে) এমন ভাবে পূর্ণতা দান করবেন যে, কোন এক যাত্রী ছানা (শহর) থেকে হাজরা মাউত (শহর) পর্যন্ত (দীর্ঘ পথ) ফাঁড়ি দেবে অথচ তার মধ্যে আল্লাহর ভয় এবং তার ছাগলের জন্য বাঘের ভয় ছাড়া কোন ভয় থাকবে না কিন্তু তোমরা বড্ড তাড়াহুড়া করছো

এটি মানসিক চিকিৎসার একটি পদ্ধতি বিধায় যদি কারো কাছে দূঃখ বেদনায় আক্রান্ত কেউ আসে, তাহলে তাকে বলুনঃ এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা আপনার চেয়ে আরো অনেক বেশী কষ্টে দিনাতিপাত করছেন যেমনঃ এমন একজন লোক আসলো, যারা সন্তান কোন একটি এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে তাকে বলা যেতে পারেঃ পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের পুরো পরিবার এক্সিডেন্টে মারা গেছে কিংবা এমন অনেক মানুষ আছে যাদের স্ত্রী এবং সন্তানরা মারা গেছে এমনকি তারা তাদের সকল সম্পদ হারিয়ে ফেলেছে

মনে করুন, কারো দশটি দোকান আছে এবং তার মধ্য থেকে একটি দোকান পুড়ে গেছে এমন ব্যক্তিকে বলা যায়ঃ এমন লোকও আছে যার দশটি কারখানা একসাথে এক স্থানেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে

মনে রাখতে হবে,  অন্যের কষ্টের কথা শুনলে নিজের কষ্ট ছোট মনে হয় বিশেষ করে যদি অন্যের কষ্ট নিজের চেয়ে বেশি হয় আরেকটি উপায় হলো সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনাগুলো দেখার যেমন বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে নবী সা. বলেছেনঃ

اُنْظُرُوا إِلى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْكُمْ ـ في مَتَاعِ الدُّنْيَا ـ وَلا تَنْظُرُوا إِلى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ؛ فَإِنَّهُ أَجْدَرُ أَلَّا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ

তোমরা দুনিয়াবী বিষয়ে তাদের দিকে তাকাও, যারা তোমাদের চেয়ে নিচে অবস্থান করছে তাদের দিকে নয়, যারা তোমাদের উপরে অবস্থান করছে কেননা এটা বেশি উপযুক্ত যেন তোমরা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তুচ্ছ না মনে করো

এর মানে হলোঃ এজন মানুষ যখন কোন বিপদ আপদে পড়ে, তখন তার উচিত তার চেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা মানুষের প্রতি নজর দেয়া এবং বলা, আলহামদুলিল্লাহ! আমি তো অনেক ভাল আছি

যখন কোন মানুষ অভাবে বা দারিদ্রতায় আক্রান্ত হয়, তখন তারচেয়ে আরো গরীব ও দরিদ্র মানুষের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর নিয়ামত বুঝা এই বিষয়টা দুনিয়ার সকল ব্যাপারে প্রযোজ্য

আরেকটি পদ্ধতি, যা মনোবিজ্ঞানীরা ব্যবহার করে থাকেন পদ্ধতিটাকে বলে আল ইলাজ আল জামায়ী বা গোষ্ঠী থেরাপী এই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে যেয়ে তারা কয়েকজন রোগীকে এক জায়গায় একত্রিত করেন-সংখ্যাটা ৭ থেকে ১০জন হতে পারে তারা একসাথে বসে কথা বলে আর চিকিৎসক তাদের কথা পর্যবেক্ষণ করে সেখানে প্রত্যেকটা রোগী অন্যের কথা শুনে বলে আলহামদুলিল্লাহ কারণ সে অনুভব করে যে, তার অবস্থা অন্য রোগীর চেয়ে ভাল আর এর মাধ্যমে এক রোগী আরেক রোগী থেকে শিখে এবং নিজের সমস্যাকে হালকা ভাবতে শুরু করে

এখানে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবেঃ মানুষ তার নিজস্ব বিবেচনায় যে কোন সমস্যাকে তা যতটুকু বড় তার চেয়ে অনেক বড় করে তোলে এখানে আমরা সূরা আলে ইমরানের একটি আয়াতের দিকে নজর দেবো, যেখানে উহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে বলা হয়েছে-যে যুদ্ধটি বহু নসীহত আর শিক্ষায় পরিপূর্ণ

আমরা যাবতীয় মনযোগ উহুদ যুদ্ধের অভিযানের দিকে নিয়ে যাই আর চিন্তা করি ঐ যুদ্ধের শুরু থেকে কি ঘটেছিল যুদ্ধের শুরুতে মুসলমানরা বিশাল সাফল্য আর চমৎকার বিজয় অর্জন করেন এমতাবস্থায় তারা যুদ্ধের গনিমত সংগ্রহের নেমে পড়েন তখন মুশরিক যুদ্ধারা পালিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু তাদের সে দিকে কোন খেয়াল ছিল না গনিমত সংগ্রহের বিষয়টা এমন পর্যায়ে পৌছে যায় যে, কিছু তিরন্দাজ-যাদেরকে আল্লাহর রাসূল সা. একটি নির্দিষ্ট এলাকা সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিলেন-তারা রাসূল সা. এর নির্দেশ অমান্য করে গনিমত সংগ্রহে নেমে পড়েন অথচ যুদ্ধের শুরুতেই রাসূল সা. এর কড়া নির্দেশ ছিল যে, তারা যেন যে কোন অবস্থায়ই তাদের জায়গা না ছাড়ে এবং সেখানে থেকে সরে না যায়

কিছু মুশরিক মুসলমানদের এই অবস্থাটা উপলব্দি করে এবং খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে তারা ঘুরে দাড়ায় এবং পিছন দিক থেকে মুসলমানদের উপর আক্রমন চালায় ফলে কাফেরদের এই আকস্মিক আক্রমণে মুসলমানদের পরাজয় ঘটে এমতাবস্তায় কিছু মুসলমান গনিমত ছেড়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেলেন এবং কিছু সংখ্যাক না পালালেও যুদ্ধের ময়দানে স্থির হয়ে থাকলেন এমতাবস্থায় তারা কাফেরদের আক্রমণের শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করলেন

সেই সময়ে আরো কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো একটি গুজবের কারণে গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ সা. শাহাদাত বরণ করেছেন অথচ রাসূল সা. তখন সকলকে স্থির থাকার এবং পলানো থেকে বিরত থাকার জন্য বলছিলেন একদিকে পরাজয়ের বিপর্যয়, আরেকদিকে নবী সা. এর মৃত্যুর গুজব মুসলমানদের মনে দুশ্চিন্তা আর হতাশার সৃষ্টি করলো

আসুন আমরা চোঁখ ফিরিয়ে কুরআনের দিকে চোঁখ রাখি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বলেনঃ

﴿إِذْ تُصْعِدُونَ وَلَا تَلْوُونَ عَلَىٰ أَحَدٍ وَالرَّسُولُ يَدْعُوكُمْ فِي أُخْرَاكُمْ فَأَثَابَكُمْ غَمًّا بِغَمٍّ لِّكَيْلَا تَحْزَنُوا عَلَىٰ مَا فَاتَكُمْ وَلَا مَا أَصَابَكُمْ ۗ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴾

“যখন তোমরা উপরে উঠছিলে এবং তোমাদের কাউকে ফিরে তাকানোর অবস্থা ছিল না, আর রাসূল সা. তোমাদের পিছন থেকে ডাকছিলেন তখন তিনি তোমাদেরকে দুঃখের পর দুঃখ দিয়েছেন-যাতে তোমরা ব্যথিত না হও সেই বিষয়ে যা তোমাদের হাতছাড়া হয়েছে এবং যা তোমাদেরকে আঘাত করেছে আর আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত  (আলে ইমরানঃ ১৫৩)

উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ বললেনঃ তিনি তোমাদেরকে দুঃখের পর দুঃখ দিয়েছেন এটা কিভাবে হয়? এবং আল্লাহ কীভাবে তাদের দুঃখ দিয়ে দৃঢ়তা দেন যাতে তারা তাদের হারানো কিংবা প্রাপ্ত যন্ত্রণায় দুঃখিত না হয়?

মুফাসসিরগন এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ প্রথম শোক হলো পরাজয় এবং লুটপাটের ক্ষতি দ্বিতীয় শোক হলো নবী সা. এর মৃত্যু প্রথম শোকে মুসলমানদেরকে শোকাহত করলো কিন্তু দ্বিতীয় শোকের কাছে প্রথম শোক কিছুই নয় বিধায়, দ্বিতীয় শোক আসার পর মুসলমানরা প্রথম শোক ভূলে গেল-তথা যুদ্ধে পরাজিত হওয়া বা তাদের সাথীদের শহীদ হওয়া বিষয়টা হালকা হয়ে গেল দ্বিতীয় শোকে মুসলমানরা যখন নিমজ্জিত, এমতাবস্থায় তারা জানতে পারলো-রাসূল সা. মারা যাননি তখন শোক শান্তিতে রূপান্তরিত হলো এবং তারা আনন্দিত হলো আল্লাহ বললেনঃ ﴿فَأَثَابَكُمْ غَمًّا بِغَمٍّ لِّكَيْلَا تَحْزَنُوا عَلَىٰ مَا فَاتَكُمْ وَلَا مَا أَصَابَكُمْ﴾ “তোমাদের ওপর একটি দুঃখের পর আরেকটি দুঃখ বর্ষণ করলেন যাতে তোমরা তোমাদের হারানো কিংবা তোমাদের উপর আসা কোন ক্ষতির জন্য দুঃখ করো না” আর এর মাধ্যমে আল্লাহ একটি শোক দিয়ে আরেকটা শোককে ভূলিয়ে দিলেন

যার কারণে, যখন কেউ বিপদে পড়ে তখন ধৈর্য ধারণ করা ও দূঃখ কমানোর একটি উপায় হলো বড় দূঃখকে স্মরণ করা, কঠিন অবস্থাকে স্মরণ করা যেমনটা আল্লাহর রাসূল সা. এর মত্যুকে স্মরণ করা

আল্লাহর রাসূল সা. যখন মৃত্যু শয্যায়, তখনকার অবস্থা হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ আল্লাহর রাসূল সা. তাঁর ও মানুষের মাঝে থাকা দরজা বা পর্দা সরালেন তখন সাহাবীরা হযরত আবু বকর রা. এর ইমামতিতে নামায আদায় করতেছিলেন এই সুন্দর অবস্থা দেখে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং প্রত্যাশা করলেন তাঁর যেন তার উম্মতের মধ্যে উত্তম কাউকে নেতৃত্বে দান করেন এবং বলেলেনঃ 

“হে মানব সকল! তোমাদের মধ্য থেকে বা মুমিনদের মধ্য থেকে যদি কেউ বিপদে পড়ে, তবে সে যেন আমার ইনতিকালের বিপদ থেকে শিক্ষা নেয় অন্য বিপদে ধৈর্য ধারণের জন্য কেননা, আমার উম্মতের কেউই আমার পরে এমন কোন বিপদে পড়বে না, যা আমার বিপদের চেয়ে তার জন্য অধিক কষ্টদায়ক হবে (ইবনে মাযাহ)

মানুষ যখন কোনো বিপদে পড়ে, তখন সে সেটাকে বিপদের প্রকৃত অবস্থা থেকে অনেক বড় মনে করে কিন্তু যখন সে সেই বিপদের প্রকৃত অবস্থা ও আঁকার জানতে পারে, তখন সে শান্ত হয়ে যায় এবং স্বস্তিতে ফিরে আসে যেমনঃ কোনো মানুষ স্বপরিবারে গাড়ি এক্সিডেন্ট করে অজ্ঞান হয়ে গেল সে ধারণা করে যে, তার পুরো পরিবারই এক্সিডেন্টে মারা গেছে ফলে তার যখন জ্ঞান ফিরে আসে, তখন সে দূঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে কিন্তু যখন তাকে জানানো হয় যে, তার কেবল দূ’টি সন্তান মারা গেছে, তখন সে বলেঃ ﴿ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَـٰلَمِينَ﴾ (আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন) যে ব্যক্তি এই ধরণের অবস্থার মধ্যে থাকে, সে খুব কঠিন থেকে কঠিনতর বিষাদের মধ্যে নিমজ্জিত থাকে কিন্তু এরপর যখন সে বুঝতে পারে যে, পরিস্থিতি তার ধারণার চেয়ে সহজ, তখন সে বিপদ কম বোধ করে

সারকথা, যে বিষয়গুলো দুঃখ কমাতে সাহায্য করে, সেগুলো হলোঃ

·         সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনাগুলোকে বিবেচনায় নেয়া

·         নিজের থেকে খারাপ অবস্থায় থাকা লোকদের দিকে দৃষ্টি দেয়া

·         বিপদের প্রকৃত পরিমাণ জানা  এবং তারপরে নিজের বিপদকে বড় বিপদের সঙ্গে তুলনা করা

পাঁচঃ জীবনের প্রতিটি দৃষ্টিঙ্গিতে বাস্তবতা ও সামগ্রিকতা এবং কল্পনাপ্রসূত পরিপূর্ণতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিরত থাকা

বেক নামক ইউরোপিয়ান এক ব্যক্তি ১৯৬৭ সালে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যেটিকে তিনি “জ্ঞাতিভিত্তিক তত্ত্ব” (Cognitive Theory) নামে অভিহিত করেন এতে তিনি বলেনঃ কিছু মানুষ বিষন্নতায় ভোগে, কারণ তারা ভুলভাবে চিন্তা করে

ডিপ্রেসনে আক্রান্ত ব্যক্তি ভূল চিন্তাভাবনা করে-এই দৃষ্টিভংগীর উদ্দেশ্য হলোঃ অনেক মানুষ চিন্তার ভূলের কারণে ডিপ্রেসনে আক্রান্ত হয় আর বাস্তবে এটা অনেক সময় সত্যও হয়

কারণ কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কল্পনানির্ভর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেঃ “আমি তখনক্ষণ অবধি সুখী হতে পারিনা, যতক্ষণ না আমার আশপাশের মানুষজন আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং আমার কলিগরাও আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে”-এধরনের দৃষ্টিভংগী বাস্তবসম্মত নয় কারণ এমন কিছু মানুষ সব সময়ই থাকবে, যাদেরকে সন্তুষ্ট করা যায় না তারা কখনো সন্তুষ্ট থাকে না বরং বাস্তবতা হলো, একজন মানুষের প্রতি কেউ কেউ সন্তুষ্ট থাকবে আর কিছু মানুষ অসন্তুষ্ট থাকেব  আর এটা এমন এক বাস্তবতা, যা সকল মানুষের জীবনে আসে বরং বাস্তবতার সৃষ্টিতে চিন্তা করলে সব মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করা একটি অসম্ভব টার্গেট-এমনটা চিন্তা করলে জীবনে নিশ্চিত ও স্বস্তিতে থাকা যায়

অন্য কেউ বলেঃ আমার স্ত্রী এমন না হয়, তেমন না হয়, তাহলে আমি সুখী হতে পারবো না এরপর সে এমন সব গুণের একটা তালিকা তৈরী করে, যা কোন একজন নারীর মাঝে পাওয়া কেবল কল্পনাতে সম্ভব-বাস্তবে নয় এমন চিন্তাভাবনা মাথায় নিয়ে সে যখন বিয়ে করে এবং স্ত্রীর মাঝে কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি দেখে, তখন সে বিরক্ত হয়, দূঃখিত হয় অথচ তার উচিত ছিল তার বাস্তববাদী হওয়া

প্রাথমিক ভাবে বেক এর তত্ত্ব নিয়ে চিন্তা করলে মনে হবে যে, বেকই প্রথম ব্যক্তি-যিনি বিষয়ে কথা বলেছেন কিন্তু বাস্তবতা হলো ইসলামিক স্কলারগণ বহু বছর আগে এই সব কথা বলেছেন

শেখ আব্দুর রহমান আস সাদী রাহি. বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি আলোকপাত করেন সহীহ মুসলিমের এই হাদীসের উপরঃ

وَلَا يَكْرَهْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً؛ إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا، رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ.

“কোনো মুমিন পুরুষ যেন মুমিনা স্ত্রীকে ঘৃণা না করে; যদি তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে অন্য একটি স্বভাব পছন্দনীয় হতে পারে

শেখ আব্দুর রহমান আস সাদী রাহি. এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেনঃ স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা সে সব মানুষ, যাদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে, তাদের সাথে আচরণটা কেমন হবে-এই হাদীসে তার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে অপরের আচরণ বিষয়ে সকলকে এমনভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে যে, সকল মানুষের মধ্যেই কোন না কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি, ঘাটতি বা অপছন্দনীয় বিষয় রয়েছে তাই যদি অনাকাংখিত কোন আচরণ যদি কারো থেকে প্রকাশ পেয়ে যায়, তাহলে  লোকটির ভাল আচরণ-যা আপনার স্মরণে রয়েছে তা বিবেচনায় নিতে হবে, যা আপনার ও তার মাঝে কর্তব্য, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা, আন্তরিকতা অক্ষুন্ন রাখা কিংবা যার মাঝে বিশেষ কোন উপকারিতা রয়েছে

আর এভাবেই মানুষের খারাপ দিক গুলো উপেক্ষা করে ভাল দিক গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পর্ক অব্যাহত রাখা, বন্ধুত্ব অক্ষুন্ন রাখা এবং পারস্পরিক সহানুভূতি ও শান্তি অর্জন করা সম্ভব

উপরের এই বিশ্লেষণটা শেখ আব্দুর রহমান আস সাদী রাহি. এর বক্তব্য বিধায়, এই ধরণের অবাস্তব চিন্তা যারা করে, তারা জীবনে আরাম ও শান্তি ভোগ করতে পারে না

যে যুবকের উদাহরণ দেয়া হয়েছিল-যে তার স্ত্রীর জন্য অবাস্তব কিছু শর্ত আরোপ করে এই ধরণে শর্ত আরোপকারী যতক্ষণ এই ধারণায় অটল থাকবে, ততক্ষণেই অবিবাহিত থাকবে

অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, সাধারণতঃ একজন যুবক একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে তার কল্পনার স্ত্রীকে খুঁজতে থাকে, অনেক অনুসন্ধান আর বারবার ব্যর্থতার পর সেই যুবক কিছু শর্তে ছাড় দিতে শুরু করে, আর কিছু শর্তে অটল থাকে যেমনঃ বয়সের ক্ষেত্রে সে ভাবে যে তার স্ত্রী এই বয়স সীমার মধ্যেই হতে হবে কিন্তু অবশেষে এই বয়সের কাউকে খুঁজে না পেয়ে সেই শর্তে ছাড় দেয় আবার সৌন্দর্যের বিষয়টাকে বিবেচনায় নেয় কাংখিত সৌন্দর্যকে এক সময় ছাড় দিতে বাধ্য হয় তখন শিক্ষাগত যোগ্যতাকে বিবেচনায় নেয় এবং এক সময় তাতেও ছাড় দেয় ছাড় দিতে দিতে এক সময় তার কামনা এমন স্তুরে পৌছে যে, তার শর্ত গুলো এমন হয়, যা যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত এবং বাস্তবে তা পাওয়া সম্ভবও বটে

মি. বেক (Beck) যে ভুল চিন্তাধারার দিকগুলো উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে রয়েছেঃ মাত্রাতিরিক্ত বড় আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিষয়গুলোকে আংশিকভাবে দেখা, একটি ভুলকে সবার ওপর প্রয়োগ করা এবং জিনিসপত্রের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ফলে, এই ধরনের মানুষ যেকোনো বিষয়ে প্রথমে যে দিকটায় নজর দেয় তা হলো-নেতিবাচক দিক আর এর ফলাফল স্বরূপ সে ব্যক্তি ক্রমাগত হতাশা ও দুঃখে নিমজ্জিত থাকে

ছয়ঃ ভাল ধারণাকে অগ্রাধিকার দেয়া

একই কাহিনী-ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে এগিয়ে থাকা অন্যদের সম্পর্কে যে মানুষ খারাপ ধারণা পোষণ করে, কষ্টটাও সেই মানুষটাই বেশি পায় যেমনঃ কেউ একজন তার পরিচিত আরেকজনের পাশ দিয়ে গেল কিন্তু সালাম দিল না পরিচিত লোকটি বিরক্ত হয়, দূঃখিত হয় সে ভাবতে থাকেঃ সে কেন আমাকে সালাম দিল না? নিশ্চই সে আমাকে অপছন্দ করে.. ইত্যাদিইত্যাদি এর মধ্য দিয়ে খারাপ ধারণার শুরু হয়ে গেল  এরপর একদিন দুদিন করে অনেক দিন পেরিয়ে যায় আর তার খারাপ ধারণা বৃদ্ধি পেতে থাকে কিন্তু ঐ ব্যক্তির শুরু থেকেই ভাল ধারণা করার সুযোগ ছিল এমন করে যে, সে হয়তো আমাকে দেখেনি, সে হয়তো অন্যমনস্ক ছিল, অথবা এমন ধারণা পোষণ করা-যাতে খারাপ ধারণার পরিবর্তে ভালটা ভাবা যায় আর এতে করে সে দূঃখ পেতো না এজন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বলেনঃ

﴿يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱجْتَنِبُوا۟ كَثِيرًۭا مِّنَ ٱلظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ ٱلظَّنِّ إِثْمٌۭ﴾

হে ঈমানদারগণ! অধিকহারে সন্দেহ করা থেকে বেঁচে থাকো নিশ্চয় কিছু কিছু সন্দেহ গোনাহের নামান্তর” (আল হুজুরাতঃ ১২)

বিধায়, যে কোন কিছুতে সন্দেহ করা বাদ দিতে হবে এটা করতে হবে নিজেদের শান্তি আর স্বস্তির জন্য আমরা যদি ভালো ধারণা করি, তাহলে আমরাই প্রশান্তি লাভ করবো কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, ভালো ধারণা রাখা মানে-প্রতারণার শিকার হওয়া নয় যেমনটা হযরত উমর রা. বলেছেনঃ لَسْتُ بِالخِبِّ وَلَا الخِبُّ يَخْدَعُنِي “আমি ধূর্ত নই, আর কেউ ধূর্ততা করে আমাকে প্রতারিতও করতে পারবে না” অর্থাৎ তিনি নিজে ছলনা বা প্রতারণা করেন না, আবার এমনও নন যে, সহজে কেউ তাকে ঠকিয়ে দিতে পারবে বরং তিনি সম্পূর্ণরূপে সচেতন ও সজাগ থাকেন

মোদ্দাকথাঃ খারাপ ধারণাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং অনুমানের ভিত্তিতে উদ্দেশ্যহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ (যা  মি. বেক অভিহিত করেছেন “অনিয়ন্ত্রিত অনুমান” নামে)

যেমনঃ একজন ডাক্তার যার একজন পুরাতন রোগীর সাথে এ্যাপোয়েন্টম্যান্ট নির্ধারিত হয়েছে-যিনি ডিপ্রেসনে আক্রান্ত নির্ধারিত সময়ে রোগী চেম্বারে উপস্থিত কিন্তু ডাক্তার পৌছলেন পনের থেকে ত্রিশ মিনিট দেরী করে এমতাবস্থায় রোগীর মনে প্রথম যে চিন্তাটা আসে তাহলোঃ ডাক্তার তাকে দেখতে চায় না কিংবা ডাক্তার তার প্রতি বিরক্ত হয়ে গেছে কিংবা বারবার এ্যাপোয়েন্টম্যান্ট নেয়াতে ডাক্তার ক্লান্ত হয়ে পড়েছে

এই ধরণের চিন্তা থেকে রোগী মারাত্মক রকমের দুঃখিত হয় এমতাবস্থায় সাক্ষাতের সময় রোগী ডাক্তারের কাছে তার সম্পর্কে এই চিন্তাভাবনার কথা বলে ফেলে অথবা সে ডাক্তারের অপেক্ষা না করে বাড়ী চলে যায় এই ভাবনা থেকে যে ডাক্তার তার চিকিৎসা করতে চায় না

অথচ রোগীর উচিত ছিল ইতিবাচক কিছু বিকল্প চিন্তা করা যেমনঃ হতে পারে ডাক্তারের গাড়ি রাস্তায় খারাপ হয়ে গেছে কিন্তু রোগী এই সম্ভাবনাটি বিবেচনাও করল না অথবা ডাক্তারের কোন ইমার্জেন্সী এসে গেছে কিন্তু এমনটাও রোগীর মাথায় আসেনি

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই রোগী আগের রাতে নিজেই ঐ ডাক্তারের কাছে এসেছিল জরুরী বিভাগে ডাক্তার তখন তার ফাইল চাইলেন, কিন্তু সংশ্লিস্ট বিভাগ ফাইল খুঁজে পায়নি তখন ডাক্তার নিজেই ফাইল বিভাগে গেলেন এবং তার ফাইল নিয়ে এলেন যখন রোগীকে এই ঘটনা জানানো হলো, তখন সে স্বস্তি পেল ও নিশ্চিন্ত হলো

তাই এক মুসলমান অন্য মুসলমানের প্রতি ভালো ধারণা রাখা উচিত আর কাফিরদের ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকা উচিত

সাতঃ কষ্টদানকারী মানুষের সাথে কিভাবে আচরণ করা উচিত?

কোন মানুষ যদি অন্য মানুষকে কষ্ট দিয়ে থাকে-বিশেষ করে কথা বা ব্যবহারের মাধ্যমে, তাহলে মনে রাখতে হবে-এটা তারই ক্ষতি, যে কষ্ট দিল-যাকে কষ্ট দিল, তার নয় যদি বিষয়টা আমলে না নেয়া হয়, তাহলে কথার মাধ্যমে কেউ কারো ক্ষতি করতে পারে না কিন্তু যদি কেউ বিষয়টি আমলে নিয়ে ভাবতে শুরু করে, তখনই মানুষ কষ্ট পাওয়া শুরু করে আর যতক্ষণ উপেক্ষা করে, ততক্ষণ শান্তিতে থাকে

এই অবস্থা কেন? কারণ মানসিক শান্তি অনেকাংশেই নির্ভর করে বিষয়টাকে কিভাবে গ্রহণ করা হয়েছে তার উপর মানুষ কি ভাবছে বা কি বলছে, তার উপর নয় নবী সা. বলেছেনঃ

أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسُ؟ إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي: مَنْ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي وَقَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ، أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ، فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ.

তোমরা কি জানো, প্রকৃত দেউলিয়া কে? আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত দেউলিয়া সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিনে নামাজ, রোযা ও যাকাত নিয়ে হাজির হবে, কিন্তু একই সঙ্গে এই মানুষটিকে গালি দিয়েছে, ওইজনকে অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারো রক্ত ঝরিয়েছে এবং কাউকে মেরেছে তখন তার নেক আমল থেকে এই ব্যক্তিকে এবং সেই ব্যক্তিকে দিয়ে দেয়া হবে-যার সাথে সে এমন এমন আচরণ করেছিল যখন তার নেক আমল শেষ হয়ে যাবে, অথচ তার উপর যাদের অধিকার আছে তাদের পাওনা এখনো বাকি থাকবে, তখন তাদের গোনাহ তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে” (মুসলিম)

সুতরাং এই মানসিকতা লালন করতে হবে যে, যে ব্যক্তি আমার গীবত করে, গালি দেয় এবং আমার বিরুদ্ধে কথা বলে, সে আসলে তার নেক আমল থেকে আমাকে দিচ্ছে এবং আমার উপকার করছে অতএব, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিন

তাই আমাদের সকলের উচিত গীবতকারীকে ধন্যবাদ জানানো

এক বুজুর্গে একটি কাহিনী প্রসিদ্ধ রয়েছে যে, কেউ একজন তাকে বললোঃ অমুক ব্যক্তি আপনার গীবত করেছে যখন বুজুর্গ নিশ্চিত হলেন যে, হ্যাঁ! কথাটি সত্য তখন তিনি গীবতকারী ব্যক্তির জন্য একটি উপহারের প্যাকেট নিয়ে তার বাড়ীতে হাজির হলেন এবং বললেনঃ

নিন, এই উপহার আপনার জন্য গীবতকারী লোকটি তাকে বললোঃ ইনশাআল্লাহ, সবকিছু ঠিক আছে তো? বুজুর্গ বললেনঃ লোকজন বলাবলি করেছে যে, তুমি আমার গীবত করেছো আর আমি জানি-যে আমার উপকার করে, তাকে প্রতিদান দেয়া আমার কর্তব্য তুমি তোমার নেক আমল থেকে আমাকে দিয়েছো, তাই তার প্রতিদান হিসাবে আমি এই উপহারটি তোমাকে দিলাম

এই সূক্ষ্ম দৃষ্টিভংগীর প্রতি একটু লক্ষ্য করুন! আমরা জানি, এই বিষয়টি একজন মানুষের জন্য কঠিন বিষয়-নিজের মনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং উত্তম পন্থায় প্রতিক্রিয়া জানানো সহজ কাজ নয় কিন্তু নিঃসন্দেহে, এই পদ্ধতি মনের প্রশান্তি, আত্মতৃপ্তি এবং দুঃখ ও হতাশা আর ডিপ্রেসন থেকে রক্ষা করে

অতএব, যদি কেউ কষ্টদায়ক কথা বলে, তবে তাকে ছেড়ে দিতে হবে এবং সেখান থেকে চলে যেতে হবে তখন কষ্টদানকারী ব্যক্তিই কষ্ট পাবে ও রাগে জ্বলবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বলেনঃ ﴿قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ﴾ বল, তোমরা তোমাদের রাগে মরে যাও (আলে ইমরানঃ ১১৯)

কিন্তু যদি আমরা নিজের মনকে সেই কথাগুলোর মধ্যে ব্যস্ত রাখি, তাহলে আমরা অবশ্যই দুঃখিত হবো

আটঃ আশা

আশার দরজা সব সময় খোলা থাকে এবং এই আশাই মানুষের দূঃখ আর কষ্ট দূর করে আর মানুষের উচিত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার সেই বাণীকে সব সময় স্মরণে রাখাঃ

﴿فَإِنَّ مَعَ ٱلْعُسْرِ يُسْرًا﴾﴿إِنَّ مَعَ ٱلْعُسْرِ يُسْرًۭا﴾

নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে আছে স্বস্তি নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি” (ইনশিরাহঃ ৫-)

এর মানে হলোঃ এমন কোন কষ্ট নাই, যার পর স্বস্তি আসে না যেমনটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা অন্যত্র বলেনঃ  ﴿سَيَجْعَلُ ٱللَّهُ بَعْدَ عُسْرٍۢ يُسْرًۭا﴾ আল্লাহ কষ্টের পর অবশ্যই স্বস্তি এনে দেবেন” (আত তালাকঃ ৭)

অর্থাৎ তোমার উপর যখনই বিপদ ও সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে, তখন জেনে রাখো-এর উপশম ও মুক্তি খুব কাছেই এসে গেছে এটাই প্রিয় নবী সা. এর হাদীসের বাস্তবতা যখন তিনি তাঁর সাহাবীদের বলেছিলেনঃ

واعلَمْ أنَّ النَّصرَ مع الصَّبرِ ، وأنَّ الفرَجَ مع الكرْبِ ، وأنَّ مع العُسرِ يُسرًا

“জেনে রাখোঃ ধৈর্যের সাথে বিজয়, কষ্টের সাথে মুক্তি রয়েছে” (তিরমিযি)

অতএব, তুমি যদি ধৈর্য ধরো, তাহলে বিজয় আসবে; আর যদি কষ্টে থাকো, তাহলে মুক্তি আসবে

এই প্রসঙ্গে ইমাম ইবনুল জাওযীর একটি মূল্যবান উক্তি প্রণিধান যোগ্য (যা তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আস সাইদ আল খাতির (صيد الخاطر)-এ উল্লেখ করেছেন) তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তির ওপর কোনো বিপদ এসেছে এবং সে যদি চায় এই বিপদ তার থেকে দূর হয়ে যাক, তাহলে সে যেন তা কল্পনায় বাস্তবতার চেয়েও বেশি কঠিন করে তোলে-তাহলে সেটা তার কাছে হালকা মনে হবে

অর্থাৎ, কষ্টকে যখন কেউ তার চেয়েও বেশি কঠিন কল্পনা করে, তখন বাস্তব কষ্টটা তুলনামূলকভাবে সহজ লাগে এবং তা সহ্য করাও সহজ হয়

সে যেন কল্পনা করে, এই বিপদের পরে যে প্রতিদান বা সওয়াব পাওয়া যাবে এবং সে যেন কল্পনা করে-এর চেয়েও বড় বিপদ যদি আসত? এই চিন্তাগুলো একজন মানুষকে ধৈর্য ধারণে সহায়তা করে এবং বিপদকে সহজভাবে মেনে নেওয়ার মানসিক শক্তি যোগায় সে যেন বুঝে নেয় যে শুধুমাত্র এই ছোট বিপদেই সীমাবদ্ধ থাকা লাভজনক অর্থাৎ, যদি তার ওপর কোনো বিপদ আসে, সে যেন মনে করে এটা তো আরও বড় বিপদের তুলনায় সামান্য সে যেন আশাবাদী হয় যে এই কষ্ট খুব দ্রুতই কেটে যাবে কারণ যদি কঠিন সংকট না আসত, তাহলে আরাম ও স্বস্তির সময়গুলোর গুরুত্ব কেউ বুঝত না

আর সে যেন জানে, এই বিপদের অবস্থান-এই কষ্ট বা দুঃসময় তার কাছে এমন, যেমন একজন মেহমান-যার প্রয়োজনীয়তা প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হয়, কিন্তু তার অবস্থানও খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়

(উপরোক্ত পুরো বক্তব্য ইমাম ইবনুল জাওযীর)

(ড. আব্দুল্লাহ আল খাতির রাহি. রচিতআল হুজন ওয় আল ইকতিয়াব” গ্রন্থের ভাবধারা অবলম্বনে রচিত)

পরের পর্বে আমরা আলোচনা করবো যে বিষয়ে তা হলো বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে ডিপ্রেসনের চিকিৎসা

Post a Comment

0 Comments