দূঃখ ও বিষন্নতাঃ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে-মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম শেষ পর্ব

 


দূঃখ ও বিষন্নতাঃ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে

পর্বঃ ৫

বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে ডিপ্রেসনের চিকিৎসা

মনোরোগের চিকিৎসকগন তাদের রোগীদের ক্ষেত্রে উপরে বর্ণিত সকল পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন। তারা রোগীকে বলেনঃ এই রোগটি নতুন কোন রোগ নয়, আপনার মতো আরো অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত আছে। বরং অনেকে আছেন, যারা আপনার চেয়ে আরো বেশেী কষ্টে আছেন। এই রোগের চিকিৎসা আছে-তবে এটি একটি দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসা-বিধায় ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

ডাক্তারের এই কথা শুনে রোগী নিজের মধ্যে স্বস্তি অনুভব করে।

কখনও কখনো মানসিক রোগের চিকিৎসকগন দলগত ভাবে চিকিৎসা ও চিন্তাধারা সংশোধনের মাধ্যমে চিকিৎসার পদ্ধতি গ্রহণ করে থাকেন।

তারা কখনও কখনো ঔষধের মাধ্যমেও চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। যদি অধিকাংশ মানুষ মনে করে যে মানসিক রোগের ডাক্তাররা রোগীদেরকে কেবল ঘুমের ঔষধ বা নেশাজাতীয় ঔষধ প্রদান করে থাকেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানসিক রোগের ডাক্তারাই প্রথম-যারা মাদকাসক্তদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন, তারা মাদকদ্রব্য প্রদান করেন ন। বরং এমন কিছু ঔষধ আছে, যেগুলো তীব্র হাতাশাগ্রস্থ রোগীদের প্রদান করা হয়ে থাকে-বিশেষ করে যখন হতাশার পিছনে কোন শারীরিক, বংশগত বা রাসায়নিক কারণ থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরী।

মানসিক রোগের চিকিৎসকরা মাঝে মাঝে বৈদ্যুতিক থেরাপিও (Electroconvulsive Therapy-ECT) ব্যবহার করেন। এ ধরণের চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষের মাঝে এক ভীতিকর ধারণা রয়েছে, যা তারা মূলত টেলিভিশন ও সিনেমা থেকে পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি এক অত্যন্ত কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি-বিশেষ করে তীব্র হতাশার ক্ষেত্রে। এই চিকিৎসার প্রভাব ওষুধের তুলনায় অনেক দ্রুত দেখা যায়।

তাই, যারা মানসিক চিকিৎসার এ ক্ষেত্র সম্পর্কে জানেন না, তারা যেন অন্যদের চিকিৎসা বন্ধ করতে পরামর্শ না দেন। তারা যেন রোগীর সুস্থতা বিলম্বিত করতে ডাক্তারদের ভীতি না ছড়ায় বা এমন কোনো আচরণ না করে।

চিকিৎসা নেওয়া শরীয়তের অতি মৌলিক একটি বিষয়; রাসুলুল্লাহ সা. আমাদেরকে চিকিৎসা গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেনঃ

تَدَاوَوْا، فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً، غَيْرَ الْهَرَمِ

“চিকিৎসা নাও, কারণ আল্লাহ  চিকিৎসা নেই এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি। তবে একমাত্র বয়স বৃদ্ধির রোগ ছাড়া।”  (আহমদ)

এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় হলোঃ চিকিৎসা হওয়া উচিত বৈধ ও অনুমোদিত পদ্ধতিতে-হারাম বা নিষিদ্ধ কোনো পদ্ধতিতে নয়। চিকিৎসকরা বলেন, যেসব ওষুধ ক্ষতিকর নয় এবং যা নেশাজাতীয় নয়, সেগুলো অনুমোদিত; এর মধ্যে রয়েছে মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত ওষুধ। যারা মনে করে এসব ওষুধ নেশাজাতীয়, তারা হয় প্রশিক্ষণ নেই এমন জায়গা থেকে ভুল তথ্য পেয়েছে বা যারা মানসিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের এমন শাখায় কাজ করে যাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই। তারা অজান্তে এমন কথা বলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা প্রকাশিত নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় ওষুধের তালিকায় মানসিক রোগের ওষুধ থাকে না। সুতরাং মানসিক রোগের ওষুধ অন্যান্য ওষুধের মতোই সব ইউরোপীয় এবং আমেরিকান দেশে নিয়মিত সরবরাহ করা হয়। 

যে চিকিৎসা দেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন। তবে কিছু মানুষ ডিপ্রেসনে আক্রান্ত রোগীকে বলেঃ না, এই ওষুধটা ছেড়ে দাও... এটা বন্ধ করো। তাদের এই সব মতামতের কারণে গোনাহও হতে পারে। কারণ তারা রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত করতে সাহায্য করছেন।

আমরা যদি শারীয়াহ সম্মত চিকিৎসা বিষয়ক বই গুলো খতিয়ে দেখি, তাহলে লক্ষ্য করেবো যে, সেখানে চিকিৎসা ও শারীয়াহ অনুযায়ী রুকইয়া এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। অর্থাৎ শরীরিক চিকিৎসা যেমন ওষুধ, বিদ্যুৎ চিকিৎসা ইত্যাদির সঙ্গে রুকইয়া করার মধ্যেও কোনো দ্বন্দ্ব নেই। রুকাইয়া হলো কুরআনের আয়াত ও নবী সা. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত দোয়া ও যিকির আযকারের মাধ্যমে আরোগ্য লাভ করা।

এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়ঃ

(ক) রুকইয়া সব ধরনের রোগের জন্য আরোগ্যের মাধ্যম, শুধুমাত্র মানসিক রোগেই সীমাবদ্ধ নয়। সেজন্য একজন মুসলমানকে শারীরিক চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিটি রোগের জন্য রুকইয়া করতেও মনোযোগী হতে হবে।

(খ) কেউ কোন রোগে আক্রান্ত হেল প্রথমেই সেই ব্যক্তির উচিত নিজেই নিজের জন্য রুকইয়া করা, যেমনটি নবী সা. করতেন। আর যদি অন্য কেউ তাকে রুকইয়া করে দেয়, তবে সেই ব্যক্তির ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে যে-সেই ব্যক্তিটি দ্বীনদান-সে যাদুকর নয়।

(গ) রুকইয়া হলো পাঠ করা ও ফুঁক দেয়া। কিন্তু মানুষ নিজেদের মতো করে এটা বাড়িয়ে নিয়েছে। যেমনঃ মারধর করা, গলা চেপে ধরার চেষ্টা, চিকিৎসা বন্ধ করার দাবি ইত্যাদি-এসবের কোন শরয়ী ভিত্তি নাই।

(ঘ) রোগীর বিশ্বাস কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার উপর থাকবে যে, তিনি হলেন নিরাময়দাতা। তিনি এই আয়াত আর রুকাইয়ার মাধ্যমে আরোগ্যদানকারী ও উপকারদানকারী। যিনি পাঠ করছেন, তিনি কোন ধরণের উপকার বা ক্ষতি করতে পারেন না।

যার কারণে সালাফরা কখনো পাঠ করা ও ফুঁক দেয়া তথা রুকাইয়ার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হয়েছেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমাকে আপনাকে এবং সবাইকে সুখী ও সমৃদ্ধশালী জীবন দান করুন। সবর আর ঈমানের আলোতে আলোকিত করুন-যাতে আমরা দুনিয়ার জীবনটা এমন ভাবে শেষ করতে পারি যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট।

(ড. আব্দুল্লাহ আল খাতির রাহি. রচিত “আল হুজন ওয় আল ইকতিয়াব” গ্রন্থের ভাবধারা অবলম্বনে রচিত)

Post a Comment

0 Comments